অর্থ নয়, দক্ষতা ও সততায় আইনজীবী হওয়ার আহ্বান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
অর্থ নয়, দক্ষতা ও সততায় আইনজীবী হওয়ার আহ্বান

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা থেকে দূরে থেকে জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর মতে, একজন আইনজীবীর প্রকৃত সাফল্য কেবল আয়-রোজগারের পরিমাণে নির্ধারিত হয় না; বরং মেধা, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা, কঠোর পরিশ্রম এবং মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্যেই একজন আইনজীবীর মর্যাদা নিহিত।

শুক্রবার রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের সম্মাননা প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত ‘ফেলিসিটেশন প্রোগ্রাম ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, পেশাজীবনের শুরুতে অনেক সময় কাজের সুযোগ এবং পারিশ্রমিক দুটিই তুলনামূলক কম থাকতে পারে। এ অবস্থায় হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরে কাজ করে যেতে হবে। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে একজন আইনজীবীর কাজের পরিধি এবং পারিশ্রমিকও বাড়বে। তাই ক্যারিয়ারের শুরুতেই অর্থের পেছনে না ছুটে নিজেকে একজন যোগ্য ও দক্ষ আইনজীবী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আইন পেশায় দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়ার জন্য কোনো শর্টকাট নেই। দুর্নীতি, অনৈতিক উপায় কিংবা দ্রুত সম্পদ অর্জনের মানসিকতা একজন আইনজীবীর পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর পরিবর্তে নিয়মিত পড়াশোনা, আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, আইন ও নজির সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষা সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আইনজীবী হিসেবে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই পরীক্ষাপদ্ধতিকে স্বচ্ছ ও কঠোর করা হয়েছে। যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সনদ অর্জন করেছেন, তারা কারও দয়া বা অনুকম্পায় নয়, নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই এই অবস্থানে পৌঁছেছেন।

এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় স্বজনপ্রীতির সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এমনকি এনরোলমেন্ট কমিটির সদস্যদের সন্তানদেরও পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার নজির রয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী। ফলে নবীন আইনজীবীদের নিজেদের যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

আইন পেশায় নৈতিকতার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, একজন আইনজীবীর কাছে তার পেশাগত পরিচয় ও আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ উপার্জনের প্রয়োজন থাকলেও সেটিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানানো উচিত নয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রেও আইনজীবীদের দায়িত্ব রয়েছে।

ক্লায়েন্টের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন ক্লায়েন্টকে তার সামাজিক, আর্থিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দেখা উচিত নয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ক্লায়েন্টের সঙ্গে যথাযথ সম্পর্ক ও আচরণ বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে আইনজীবী হিসেবে নিজের পেশার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখাও জরুরি।

সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আইনজীবীদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, আইনজীবীর দায়িত্ব কেবল পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মামলা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেসব মানুষ আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আইনি সহায়তা নিতে পারেন না, তাদের পাশে দাঁড়ানোও একজন আইনজীবীর সামাজিক দায়িত্বের অংশ।

নিজের আইনজীবী জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পেশাগত জীবনে সবকিছু অর্থের মানদণ্ডে বিচার করা ঠিক নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ একজন আইনজীবী যখন অসহায় কোনো মানুষকে ন্যায়বিচার পেতে সহযোগিতা করেন, তখন তার পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্বও পূরণ হয়।

নবীন আইনজীবীদের নিয়মিত পড়াশোনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন আইনমন্ত্রী। তাঁর মতে, আইন এমন একটি পেশা যেখানে শেখার প্রক্রিয়া কখনো শেষ হয় না। নতুন আইন, সংশোধনী, আদালতের রায় এবং আইনি ব্যাখ্যার সঙ্গে নিজেকে নিয়মিত হালনাগাদ রাখতে হয়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম শেষ করে একজন ভালো আইনজীবী হওয়া সম্ভব নয়; পেশাজীবনেও ধারাবাহিক অধ্যয়ন ও অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে।

বিশেষ করে ভালো ড্রাফটিং দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, একজন আইনজীবীর পেশাগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সঠিকভাবে আইনি নথি ও আবেদন প্রস্তুত করতে পারা। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত অনুশীলন, অভিজ্ঞ আইনজীবীদের কাছ থেকে শেখা এবং আদালতের বাস্তব কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা অর্জন নবীনদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

দেশে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী থাকলেও তাদের পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ এখনো পর্যাপ্ত নয় বলেও উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। আইনজীবীদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে আইন পেশার মান আরও উন্নত হবে এবং বিচারপ্রার্থীরাও এর সুফল পাবেন।

আইন পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও দক্ষতাভিত্তিক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এমন একটি আইনজীবী সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি মেধা, দক্ষতা, সততা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে পেশাগত সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতের আইনজীবীদের শুধু আদালতকেন্দ্রিক পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নাগরিক হিসেবেও নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষায় দক্ষ আইনজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য পেশাগতভাবে দক্ষ এবং নৈতিকতাসম্পন্ন আইনজীবী সমাজ প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএপির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া এবং স্কুল অব ল’-এর ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. এম এ বাকি খলিলি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউএপির ডিপার্টমেন্ট অব ল’ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. নূর-ই-মেডিনা সূরাইয়া জেসমিন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ইউএপির আইন বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের সম্মাননা দেওয়া হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সম্মাননাপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েট এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

নবীন আইনজীবীদের জন্য আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—আইন পেশায় দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য অর্জনের ভিত্তি দ্রুত অর্থ নয়, বরং জ্ঞান ও যোগ্যতা। পেশাগত জীবনের শুরুতে আর্থিক প্রত্যাশা সীমিত থাকলেও সততা, অধ্যবসায় ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে গেলে সময়ের সঙ্গে একজন আইনজীবী নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন। একই সঙ্গে মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে এই পেশা শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত