চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদীতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদীতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামে মরা পাগলা নদীতে গোসল করতে নেমে একই সঙ্গে পাঁচ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে দেড়টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য, জুমার নামাজের সময় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মসজিদে থাকায় শিশুরা কখন নদীতে নেমেছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে কেউ জানতে পারেননি।

নিহত পাঁচ শিশু হলো মো. মাসুদের মেয়ে সুমাইয়া (১০) ও আরিবা (৮), নেমাজের মেয়ে সুমি (১২) ও সুরাইয়া (৯) এবং শরিফুলের একমাত্র মেয়ে শরীফা (১২)। একই এলাকার পাঁচ শিশুর একসঙ্গে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় চর চাকলা গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুরে কয়েকজন শিশু চর চাকলা এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মরা পাগলা নদীতে গোসল করতে নামে। প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই তারা পানিতে নেমেছিল। কিন্তু একপর্যায়ে একে একে পাঁচ শিশু পানিতে ডুবে যায়। ঘটনাটি বুঝতে পেরে স্থানীয় লোকজন নদীতে নেমে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম হাম্মাদ জানান, শুক্রবার হওয়ায় দুপুরের ওই সময়ে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদে গিয়েছিলেন। ফলে শিশুরা কখন নদীতে গোসল করতে নেমেছিল, তা পরিবারের সদস্য কিংবা আশপাশের লোকজন প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরে শিশুদের খোঁজ করতে গিয়ে তারা নদীতে ডুবে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চর চাকলা গ্রামের পাশের জলধারাটি স্থানীয়ভাবে মরা পাগলা নদী নামে পরিচিত। এটি পদ্মা নদীর একটি শাখা। বছরের সব সময় এখানে একই পরিমাণ পানি থাকে না। বর্ষাকালে বৃষ্টি ও পদ্মার পানি বেড়ে গেলে নদীটিতে পানি জমে যায় এবং আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে নদীর তলদেশ ও আশপাশের জমিতে কৃষিকাজ করা হয়।

সাম্প্রতিক বৃষ্টি এবং পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে মরা পাগলা নদীতে পানি বেড়েছিল। সেই পানিতেই শুক্রবার দুপুরে পাঁচ শিশু গোসল করতে নামে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পানিতে নামার পর কোনো একপর্যায়ে তারা ডুবে যায়। একই সময়ে পাঁচ শিশুর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা বুঝতে না পারায় দ্রুত তাদের উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে যান। অনেকে নদীতে নেমে শিশুদের খোঁজ শুরু করেন। উদ্ধারের চেষ্টার পর পাঁচ শিশুকে পানি থেকে তোলা হয়। তবে তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। স্বজনদের কাছে একে একে শিশুদের মৃত্যুর খবর পৌঁছালে এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

একটি পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু এই ঘটনায় শোকের মাত্রাকে আরও গভীর করেছে। মো. মাসুদের দুই মেয়ে সুমাইয়া ও আরিবা একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। অন্যদিকে নেমাজের দুই মেয়ে সুমি ও সুরাইয়াও আর নেই। শরিফুলের একমাত্র মেয়ে শরীফার মৃত্যুতেও পরিবারটি শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। অল্প বয়সী পাঁচ শিশুর এমন আকস্মিক মৃত্যু স্বজনদের কাছে যেন বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীটির পানি বাইরে থেকে তুলনামূলক শান্ত মনে হলেও বর্ষায় কোথাও কোথাও গভীরতা বেড়ে যেতে পারে। শিশুদের জন্য এ ধরনের জলাশয়ে গোসল বা সাঁতার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে নদীর তলদেশে গভীরতা, কাদা কিংবা পানির স্রোত সম্পর্কে ধারণা না থাকলে মুহূর্তেই বিপদ ঘটতে পারে।

ঘটনার সময় গ্রামের বড় একটি অংশ জুমার নামাজে থাকায় শিশুদের ওপর তাৎক্ষণিক নজরদারি ছিল না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। শিশুদের নিরাপদে নদী বা জলাশয়ের কাছে যাওয়া এবং পানিতে নামার বিষয়টি নজরে রাখা কতটা জরুরি, এ ঘটনাটি আবারও তা সামনে এনেছে। বর্ষাকালে নদী, খাল, বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে পানির পরিমাণ ও গভীরতা দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হক জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঘটনার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করছে। একই সঙ্গে নিহত শিশুদের পরিচয় ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

একসঙ্গে পাঁচ শিশুর মৃত্যু শুধু পাঁচটি পরিবারকেই শোকাহত করেনি, পুরো চর চাকলা গ্রামকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। যে নদীর পানিতে শিশুরা হয়তো খেলতে ও গোসল করতে নেমেছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই সেই নদীই তাদের পরিবারের কাছে পরিণত হয়েছে অপূরণীয় বেদনার প্রতীকে।

স্থানীয়দের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এমন দুর্ঘটনা কীভাবে এড়ানো যেত এবং ভবিষ্যতে শিশুদের নদী ও জলাশয়ের ঝুঁকি থেকে কীভাবে নিরাপদ রাখা সম্ভব। বর্ষাকালে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামাঞ্চলের নদী ও জলাশয়গুলোতে শিশুদের বিচরণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবারের সদস্যদের নজরদারি এবং স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।

চর চাকলার পাঁচ শিশুর আকস্মিক মৃত্যু তাই কেবল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি বর্ষাকালে শিশুদের পানিতে নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার ও সমাজের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। পাঁচটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ এক মুহূর্তে থেমে যাওয়ার এই ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক। স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের শোকের মধ্যে শুক্রবারের বিকেলটি চর চাকলা গ্রামের জন্য হয়ে উঠেছে এক স্মরণীয় বিষাদের দিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত