এআই সহায়তায় মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ যুক্তরাজ্যে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার
এআই সহায়তায় মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ যুক্তরাজ্যে

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা দৈনন্দিন প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের শরীরের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার শুরু হয়েছে নতুন মাত্রায়। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চিকিৎসকেরা প্রথমবারের মতো অস্ত্রোপচার চলার সময় সরাসরি এআইয়ের সহায়তা নিয়ে একজন রোগীর মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ করেছেন। চিকিৎসকদের দাবি, বিশ্বে লাইভ এআই সহায়তায় মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণের ক্ষেত্রে এটি প্রথম সফল অস্ত্রোপচার।

অস্ত্রোপচারটি করা হয় লন্ডনের ন্যাশনাল হসপিটাল ফর নিউরোলজি অ্যান্ড নিউরোসার্জারি, যা ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হসপিটালসের আওতাধীন। এতে অংশ নেন ৪৮ বছর বয়সী রাইস হিবার্ট। তাঁর মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থির কাছে থাকা একটি টিউমার ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তির ওপর চাপ তৈরি করছিল। টিউমারটির অবস্থান ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকায়। আশপাশেই ছিল গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় সামান্য ভুলও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারত।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিউমারটি অপসারণ না করা হলে হিবার্টের দৃষ্টিশক্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত এবং একপর্যায়ে তিনি অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর অবশ্য তাঁর দৃষ্টিশক্তির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ঘুম থেকে ওঠার পরই চারপাশ আগের তুলনায় অনেক পরিষ্কার দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

হিবার্টের শারীরিক সমস্যা অবশ্য হঠাৎ করে শুরু হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাঁটতে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারান এবং খিঁচুনিতে আক্রান্ত হন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁর মস্তিষ্কে টিউমারের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। শুরুতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর উপসর্গ বাড়তে থাকায় চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।

এ সময় তাঁকে নতুন ধরনের গবেষণামূলক অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। রোগী হিসেবে এআইয়ের সহায়তায় পরিচালিত এই পদ্ধতিতে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেন হিবার্ট। গবেষণায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে তাঁর যুক্তি ছিল, রোগীরা নতুন চিকিৎসা ও গবেষণায় অংশ না নিলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্ভব নয়।

অস্ত্রোপচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এআইয়ের কাজের ধরন। সাধারণভাবে অস্ত্রোপচারের আগে করা স্ক্যান ও চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মস্তিষ্কের ভেতরের গঠন সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়। কিন্তু এই অস্ত্রোপচারে এআই সরাসরি অস্ত্রোপচারের সময় ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে। ভিডিও থেকে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শনাক্ত করে চিকিৎসকদের সামনে তা তুলে ধরেছে।

পিটুইটারি গ্রন্থি মস্তিষ্কের নিচের অংশে অবস্থিত এবং এর আশপাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ু রয়েছে। এই এলাকায় কাজ করার সময় কয়েক মিলিমিটারের ভুলও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে যুক্ত স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগী দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিতে আঘাত লাগলেও গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে অস্ত্রোপচারের সময় নিরাপদ পথ খুঁজে বের করা ছিল চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এই জায়গাতেই এআই প্রযুক্তিটি চিকিৎসকদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দিয়েছে। অস্ত্রোপচারের সময় এন্ডোস্কোপের ক্যামেরা থেকে পাওয়া লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কাঠামো শনাক্ত করেছে। রক্তনালি, স্নায়ু এবং অস্ত্রোপচারের যন্ত্রের অবস্থান ও পারস্পরিক সম্পর্কও বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা রয়েছে সিস্টেমটির। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা কোন অংশ এড়িয়ে টিউমার অপসারণ করবেন, সে বিষয়ে আরও তথ্য পেয়েছেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এআই নিজে কোনো অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। চিকিৎসকরাই পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। এআই মূলত একজন অতিরিক্ত সহকারীর মতো কাজ করেছে, যা অস্ত্রোপচারের দৃশ্য বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছে। অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব চিকিৎসকদের কাছেই ছিল।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা বহু আগ থেকেই এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। এআই সিস্টেমটি তৈরি করেছে ইউসিএলের হকস ইনস্টিটিউট। আগের শত শত এন্ডোস্কোপিক পিটুইটারি অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে প্রযুক্তিটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এসব ভিডিওতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কাঠামো চিহ্নিত করে এআইকে সেগুলো শনাক্ত করতে শেখানো হয়েছে।

প্রযুক্তিটির কারিগরি নেতৃত্বে রয়েছেন ইউসিএলের রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ ড. সোফিয়া বানু। গবেষকদের মতে, শত শত অস্ত্রোপচারের ভিডিও বিশ্লেষণের ফলে এআই এমন বিপুলসংখ্যক অস্ত্রোপচারের উদাহরণ থেকে শিখেছে, যা একজন চিকিৎসকের পুরো কর্মজীবনেও সরাসরি দেখা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই অস্ত্রোপচারের সময় এটি চিকিৎসকদের জন্য এক ধরনের ‘দ্বিতীয় জোড়া চোখ’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন ইউসিএলের কুইন স্কয়ার ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজির অধ্যাপক ও পরামর্শক নিউরোসার্জন হানি মার্কাস। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অস্ত্রোপচারবিষয়ক গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া ড্যানিয়াল খান। চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচারে প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা দখল করা নয়, বরং চিকিৎসকদের কাছে আরও দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়া।

অস্ত্রোপচারের পর হিবার্টের অভিজ্ঞতাও ছিল আশাব্যঞ্জক। তিনি জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের পর চোখ খোলার সময় তিনি ঘরের চারপাশ অনেক পরিষ্কারভাবে দেখতে পান। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি নিজে হাঁটাচলা করতে সক্ষম হন। দীর্ঘ সময় ধরে যে দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা অনুভব করছিলেন, সেটিও অনেকটাই কমে আসে। বর্তমানে তিনি বাড়িতে থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং হাঁটার সময়ও বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

এই সাফল্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গের অস্ত্রোপচারে চিকিৎসকদের সামনে থাকা ছোট ছোট কাঠামো শনাক্ত করতে প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের সময়ই তথ্য দেওয়ার সক্ষমতা এই প্রযুক্তিকে প্রচলিত অস্ত্রোপচার-পূর্ব বিশ্লেষণ থেকে আলাদা করে তুলেছে।

তবে এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি সতর্কতার প্রয়োজনও রয়েছে। এআইয়ের প্রশিক্ষণ যত উন্নতই হোক, প্রতিটি রোগীর শারীরিক গঠন আলাদা। একটি অস্ত্রোপচারে কার্যকর প্রযুক্তি অন্য পরিস্থিতিতেও একই মাত্রায় কার্যকর হবে কি না, তা আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর নিরাপত্তা, প্রযুক্তির নির্ভুলতা এবং চিকিৎসকের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সমন্বয়েই ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

যুক্তরাজ্যের এই অস্ত্রোপচার সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষণাটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ এবং গুগলের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে। ইউসিএল হাসপাতালভিত্তিক গবেষণা ও চিকিৎসা অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এতে সহায়তা করেছে।

একজন রোগীর দৃষ্টিশক্তি রক্ষার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে। চিকিৎসকের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যদি এআইয়ের দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা যুক্ত হয়, তাহলে অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারে ঝুঁকি কমানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন আরও পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং কঠোর নিরাপত্তা যাচাই।

হিবার্টের জন্য এই অস্ত্রোপচার ছিল দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা থেকে ফিরে আসার লড়াই। আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এটি মানুষের দক্ষতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। এআই চিকিৎসকের বিকল্প নয়—বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি চিকিৎসকের সিদ্ধান্তকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও নির্ভুল করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত