ভারতে পাচারের আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ টন সার জব্দ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
ভারতে পাচারের আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ টন সার জব্দ

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৪ টন সার উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। উদ্ধার করা সারের মধ্যে রয়েছে সাড়ে ৯ টন ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) এবং সাড়ে ১৪ টন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি)। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এসব সার অবৈধভাবে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুত করা হয়েছিল। অভিযানের সময় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ এসব সার উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার সকালে বিজিবির ২৫ ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়।

বিজিবি-২৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাব্বার আহমেদ জানান, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতার অংশ হিসেবে বিশেষ টহল পরিচালনা করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ইসলামপুর এলাকায় একটি অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অভিযান পরিচালনাকারী বিশেষ টহল দল সীমান্ত পিলার ২০০১/এমপি থেকে আনুমানিক পাঁচ কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর এলাকায় অবস্থান নেয়। সেখানে সন্দেহজনক একটি ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সার পাওয়া যায়। পরে ওজন ও ধরন যাচাই করে দেখা যায়, ট্রাকটিতে সাড়ে ৯ টন টিএসপি সার এবং সাড়ে ১৪ টন ডিএপি সার রয়েছে। সব মিলিয়ে উদ্ধার করা সারের পরিমাণ প্রায় ২৪ টন।

বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ট্রাকে থাকা সারের কাগজপত্রও পরীক্ষা করা হয়। তবে এসব সার পরিবহন বা মজুতের বৈধ কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। এ কারণে সেগুলো বৈধভাবে পরিবহন করা হচ্ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, সীমান্তপথে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যেই সারগুলো মজুত করা হয়েছিল।

তবে অভিযানের সময় ট্রাকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে আটক করা যায়নি। ফলে উদ্ধার হওয়া সারের সঙ্গে কারা জড়িত, কোথা থেকে এসব সার সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং কোথায় নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব বিষয়ে পরবর্তী তদন্তে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উদ্ধার করা সারসহ ট্রাকটি আখাউড়া কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সার ও পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালান প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বিজয়নগর, আখাউড়া ও আশপাশের সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা ধরা পড়ে। সীমান্তের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিভিন্ন স্থানে তুলনামূলক সহজ যোগাযোগের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চোরাচালানিরা নানা ধরনের পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে।

এবারের ঘটনায়ও সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে বিপুল পরিমাণ সার পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সংশ্লিষ্টরা। সীমান্তের কাছাকাছি কোনো এলাকায় পণ্য মজুত করে পরে সুযোগ বুঝে তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হতে পারে।

সার বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় সময়ে মানসম্মত সার পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টিএসপি ও ডিএপি ফসফরাসসমৃদ্ধ সার হিসেবে কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব সারের সরবরাহ, মূল্য ও বিতরণব্যবস্থার ওপর কৃষকের উৎপাদন খরচ এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদনের ওপরও প্রভাব পড়ে।

এই বাস্তবতায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য সরবরাহ করা সার অবৈধভাবে সীমান্তের বাইরে চলে গেলে স্থানীয় কৃষকদের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে সরকারি ভর্তুকি বা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় সরবরাহ করা কোনো পণ্য চোরাচালানের মাধ্যমে অন্য দেশে গেলে তা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান বন্ধে শুধু পণ্য উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; এর পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোথা থেকে পণ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, কারা পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত, কোথায় মজুত করা হচ্ছে এবং সীমান্তের ওপারে কারা এর সম্ভাব্য ক্রেতা বা সহযোগী—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হলে চোরাচালানের মূল চক্র শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

বিজিবি-২৫ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ও আখাউড়া এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার ও চোরাচালান প্রতিরোধে অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য পারাপারের চেষ্টা ঠেকাতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

২৪ টন সার উদ্ধারের ঘটনাটি সেই ধারাবাহিক অভিযানেরই অংশ। তবে উদ্ধার হওয়া সারের প্রকৃত মালিক কারা এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চোরাচালানচক্র রয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কাউকে আটক করা না যাওয়ায় তদন্তের পরবর্তী ধাপেই এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।

এদিকে বিপুল পরিমাণ সার উদ্ধার হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। কৃষি উপকরণ যাতে নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের অংশ না হয় এবং কৃষকের প্রয়োজনীয় সার সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, সে জন্য সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, কাস্টমসের আইনগত প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী তদন্তের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া সার ও ট্রাকটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে সার ভারতে পাচারের চেষ্টা হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

সীমান্তের নিরাপত্তা ও দেশের কৃষি অর্থনীতির স্বার্থে চোরাচালান প্রতিরোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখা জরুরি। কারণ সীমান্তপথে একটি চালান আটক করা শুধু একটি অবৈধ পরিবহন ঠেকানো নয়, বরং দেশের বাজার, কৃষক এবং সরকারি সরবরাহব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য চাপও কমাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত