প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর বনানীর ইকবাল সেন্টার ছেড়ে তেজগাঁওয়ের শান্তা পিনাকলে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক। নতুন ভবনে যাওয়ার ফলে শুধু কর্মপরিবেশে পরিবর্তনই আসছে না, ভবন ভাড়া বাবদ ব্যাংকটির বার্ষিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, নতুন কার্যালয়ে স্থানান্তরের ফলে বছরে প্রায় ৫৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে।
এত দিন বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের ইকবাল সেন্টারে প্রধান কার্যালয় পরিচালনা করত প্রিমিয়ার ব্যাংক। ভবনটি ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এইচ বি এম ইকবালের মালিকানাধীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ব্যাংকটির দায়িত্ব থেকে সরে যান। এরপর নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধান কার্যালয়ের ভবন ভাড়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হয়।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি আগস্ট মাস থেকে প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম শান্তা পিনাকলে স্থানান্তর করা হয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত এই ভবনটি দেশের প্রথম ৪০ তলা ভবন হিসেবে পরিচিত। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। নতুন কার্যালয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাতটি ফ্লোরে মোট ১ লাখ ১ হাজার ৯২০ বর্গফুট জায়গা নেওয়া হয়েছে।
নতুন ভবনে প্রতি বর্গফুটের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ টাকা। এর সঙ্গে প্রতি বর্গফুটে ২০ টাকা করে সেবা মাশুল দিতে হবে। সব মিলিয়ে প্রধান কার্যালয়ের জন্য ব্যাংকটির মাসিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ বছরে ভবন ভাড়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় হবে প্রায় ১৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
অন্যদিকে ইকবাল সেন্টারে ব্যাংকটি ১৯টি তলায় প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করত। সেখানে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ছিল ৫০৬ টাকা। এর বাইরে প্রতি বর্গফুটে মাসে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত সেবা মাশুল দিতে হতো। ফলে শুধু ভাড়া বাবদ ব্যাংকটির মাসিক ব্যয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ১৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং বছরে তা দাঁড়াত ৭৪ কোটি ৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
দুই ভবনের ভাড়া তুলনা করলে ব্যবধানটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নতুন কার্যালয়ে স্থানান্তরের পর প্রতি মাসে প্রায় ৪ কোটি ৬৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা কম ব্যয় হবে। এক বছরে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫৫ কোটি ৭৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ভবন পরিবর্তনের কারণে ব্যয় কমার পাশাপাশি আর্থিক সূচকেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, ব্যাংকটিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর লক্ষ্যে কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের ভবনে ভাড়া বাবদ ব্যয় ছিল অনেক বেশি। নতুন ভবনে যাওয়ার ফলে একই সঙ্গে কর্মপরিবেশ উন্নত এবং ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক কার্যক্রম আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন।
তবে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্ন ছিল না। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনজুর মফিজ বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া একটি চিঠিতে স্থানান্তরের সময় একটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সার্ভার ইকবাল সেন্টার থেকে শান্তা পিনাকলে নেওয়ার জন্য দুটি ট্রাক ভাড়া করা হয়েছিল। রাতের দিকে একদল বহিরাগত ব্যক্তি ট্রাক দুটির চাবি নিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়।
ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়, পরে ওই ব্যক্তিদের চাপে ট্রাক থেকে মালামাল নামিয়ে ইকবাল সেন্টারের ১০ তলার প্রযুক্তি বিভাগে নেওয়া হয়। একই সময়ে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি অজ্ঞাতনামা দল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেয়ারম্যানকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে রাত ১০টার দিকে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হলে একজন উপপরিদর্শক ও দুই কনস্টেবল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। এরপর ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রধান কার্যালয় ত্যাগ করেন বলে জানানো হয়েছে।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান অভিযোগ করে বলেছেন, ইকবাল সেন্টারে তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা হয়েছিল। তাঁর দাবি, কোনোভাবে তিনি সেখান থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনটি ছেড়ে ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এক ধরনের ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের পেছনে শুধু ভাড়া কমানোর বিষয় নয়, ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগও নতুন ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে প্রিমিয়ার ব্যাংকে এইচ বি এম ইকবালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক বেনামি ঋণের তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অর্থ বিদেশে, বিশেষ করে দুবাই ও মালয়েশিয়ায় পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ার গ্রুপের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে এ পর্যন্ত ১৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এইচ বি এম ইকবাল, তাঁর দুই ছেলে, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যকে আসামি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন এইচ বি এম ইকবালের কার্যালয়ে অভিযান চালানোর পর সেটি সিলগালা করেছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে একদিকে ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সাবেক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগ ও আইনি বিষয়ও সামনে রয়েছে।
একটি ব্যাংকের জন্য প্রধান কার্যালয়ের ভবন ভাড়া বড় ধরনের পরিচালন ব্যয়ের অংশ হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ভাড়া চুক্তিতে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ও সেবা মাশুলের পার্থক্য সময়ের সঙ্গে বড় অঙ্কের ব্যয়ে পরিণত হয়। প্রিমিয়ার ব্যাংকের ক্ষেত্রে নতুন কার্যালয়ে স্থানান্তরের পর যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয়ের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রধান কার্যালয়ের আয়তনও নতুন ভবনে আগের তুলনায় কমেছে। ইকবাল সেন্টারে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার বর্গফুট জায়গা ব্যবহারের বিপরীতে শান্তা পিনাকলে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৯২০ বর্গফুট। অর্থাৎ তুলনামূলক কম জায়গা ব্যবহার করেও ব্যাংকটি নতুন ও আধুনিক একটি ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ফলে ভবিষ্যতে জায়গা ব্যবহারের দক্ষতা এবং প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ব্যাংকের বর্তমান কর্তৃপক্ষের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে এই ব্যয় সাশ্রয়কে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক উন্নতিতে রূপ দেওয়া। ভবন ভাড়া কমার ফলে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা ব্যাংকের পরিচালন দক্ষতা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়ার যথাযথ অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের আস্থা অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ওপর।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ইকবাল সেন্টার থেকে শান্তা পিনাকলে স্থানান্তর তাই শুধু একটি ভবন পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমানো, কর্মপরিবেশ পুনর্গঠন এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। নতুন কার্যালয়ে কার্যক্রম কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয় এবং সাশ্রয় হওয়া অর্থ ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখে, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়।