প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নেপালে অবকাশযাপনে গিয়ে বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী তাসরিফ খান। দেশটির পর্যটন এলাকা ঘান্দ্রুকে দুই দিন ধরে আটকা পড়ে আছেন তিনি ও তাঁর সফরসঙ্গীরা। যে সড়ক দিয়ে তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল, বন্যা ও ভূমিধসে সেটির বিভিন্ন অংশ ধসে যাওয়ায় আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে স্বাভাবিক যাতায়াত।
তাসরিফ জানিয়েছেন, সময়মতো ঘান্দ্রুক থেকে রওনা হলে তাঁরাও ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়তে পারতেন। শেষ মুহূর্তে যাত্রা পিছিয়ে যাওয়াকে তিনি এক অর্থে সৌভাগ্য হিসেবেই দেখছেন। এখন তাঁদের প্রধান চিন্তা নিরাপদে সেখান থেকে বের হয়ে দেশে ফেরা।
ছুটি কাটাতে গত ২০ আগস্ট নেপালে যান তাসরিফ। মঙ্গলবার তাঁরা পৌঁছান কাস্কি জেলার ঘান্দ্রুক গ্রামে। অন্নপূর্ণ অঞ্চলের প্রায় দুই হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পাহাড়ি পর্যটন এলাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। সেখানে গিয়ে কয়েক দিন নিরিবিলি সময় কাটানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু এর মধ্যেই নেপালের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও পাহাড়ধসের খবর তাঁদের ফেরার পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।
ঘান্দ্রুকে অবস্থানরত তাসরিফ জানান, তাঁদের আশপাশে বড় ধরনের প্রাণহানি বা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ তাঁরা সরাসরি দেখেননি। তবে বন্যা ও পাহাড়ধসের প্রভাব পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থায়। ঘান্দ্রুক থেকে বের হওয়ার প্রধান সড়কের একাধিক অংশ ধসে গেছে। কোথাও কোথাও সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ওই পথে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী বুধবারই ঘান্দ্রুক থেকে বের হয়ে আসার কথা ছিল তাসরিফদের। কিন্তু কিছুটা দেরি হওয়ায় তাঁদের গাইড ওই দিন আর যাত্রা না করার পরামর্শ দেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন, যে পথ দিয়ে ফেরার কথা ছিল, তার বিভিন্ন অংশ ইতোমধ্যে ধসে গেছে।
তাসরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তাঁরা যদি গাইডের পরামর্শ উপেক্ষা করে যাত্রা করতেন, তাহলে বিপদের মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যে রাস্তা দিয়ে ফিরব, সেটি পুরো ধসে গেছে। সময়মতো বের হলে হয়তো আমরাও বিপদের মধ্যে পড়তাম। দেরি হওয়াটাই আমাদের রক্ষা করেছে।’
পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো একটি পথ কিছুক্ষণ আগেও নিরাপদ থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাসরিফদের ক্ষেত্রেও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি নিরাপদ বিকল্প পথ খুঁজে বের করা, যেখান দিয়ে তাঁদের ঘান্দ্রুক থেকে বের হয়ে মূল যোগাযোগব্যবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
এ জন্য তাঁদের গাইড স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং বিকল্প পথের সন্ধান করছেন। গাইড ফিরে আসার পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে আরও দুই থেকে তিন দিন ঘান্দ্রুকেই অবস্থান করতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন তাসরিফ।
শুধু যোগাযোগব্যবস্থার সংকট নয়, দীর্ঘ সময় আটকা পড়ে থাকায় আর্থিক দুশ্চিন্তাও তৈরি হয়েছে। তাসরিফ জানান, তাঁর কাছে অল্প কিছু নেপালি রুপি এবং প্রায় ১০০ মার্কিন ডলার রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় কার্ড বা ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ সীমিত হওয়ায় নগদ অর্থ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এর মধ্যে নতুন করে দেশে ফেরার টিকিট পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে কখন কীভাবে দেশে ফিরবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সড়কপথ পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব না হলে নদীর পাশ দিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়ার একটি বিকল্পের কথা সামনে এসেছে। এই পথে যেতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত হাঁটতে হতে পারে। কিন্তু বন্যা ও ভূমিধসের পরিস্থিতিতে এমন পাহাড়ি পথও যে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ, তা বুঝতে পারছেন তাসরিফরা। তাই শুধু দ্রুত বের হয়ে আসার পরিবর্তে নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
একদিকে পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়া, অন্যদিকে দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অবকাশযাপনের আনন্দ এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। কয়েক দিনের বিশ্রামের উদ্দেশ্যে নেপালে গেলেও বর্তমানে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য নিরাপদে দেশে ফিরে আসা।
টানা কাজের ব্যস্ততার পর অবসর কাটাতেই নেপালে গিয়েছিলেন তাসরিফ। দেশে ফিরে তাঁর বেশ কিছু সংগীত পরিকল্পনাও ছিল। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রোমান্টিক ঘরানার গান ‘বৃষ্টি’। নেপাল থেকে ফেরার পর রক ঘরানার নতুন গান ‘জীবনের চাকা’র মিউজিক ভিডিও ধারণের পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। গানটিতে জীবন, প্রেম এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয় তুলে ধরার কথা রয়েছে।
কিন্তু প্রকৃতির আকস্মিক পরিস্থিতি আপাতত সেই সব পরিকল্পনাকে পিছিয়ে দিয়েছে। শিল্পীর কাছে এখন নতুন গান, মিউজিক ভিডিও কিংবা কাজের ব্যস্ততার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিরাপদে দেশে ফেরা।
তাসরিফের বক্তব্যে সেই উদ্বেগের পাশাপাশি স্বস্তির একটি অনুভূতিও স্পষ্ট। সময়মতো যাত্রা না করায় তাঁরা হয়তো বড় বিপদ এড়াতে পেরেছেন। কিন্তু সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পাহাড়ি সড়ক কখন খুলবে, বিকল্প পথ কতটা নিরাপদ, কিংবা কখন দেশে ফেরার টিকিট পাওয়া যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তাঁদের কাছে নেই।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নয়, সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পাহাড়ি এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আটকে পড়া মানুষের দ্রুত বের হয়ে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। একই সঙ্গে নদীর পানি, নতুন করে ভূমিধস এবং সড়ক ধসের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
এই অবস্থায় তাসরিফ ও তাঁর সফরসঙ্গীরা স্থানীয় প্রশাসন ও গাইডের পরামর্শ মেনে চলছেন। ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে নিরাপদ বিকল্প খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। দেশে থাকা স্বজন ও ভক্তদের মধ্যেও তাঁদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাসরিফের প্রত্যাশা একটাই—পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং নিরাপদে দেশে ফিরতে পারবেন তাঁরা। নিজের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘শুধু নিরাপদে দেশে ফিরতে চাই। সবার কাছে দোয়া চাই, আমরা যেন সুস্থভাবে প্রিয়জনদের কাছে ফিরতে পারি।’
নেপালের পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল আনন্দ ও বিশ্রামের প্রত্যাশায়, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়। তাসরিফদের ক্ষেত্রে সময়মতো যাত্রা না করাটাই হয়তো বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছে। এখন স্থানীয় পরিস্থিতি, আবহাওয়া ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাঁদের। নিরাপদ পথ নিশ্চিত হলেই শুরু হবে দেশে ফেরার নতুন যাত্রা।