প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম ম্যাককুয়ারি দ্বীপে অত্যন্ত সংক্রামক এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লুর সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। এখনো দ্বীপটিতে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত না হলেও বিপুলসংখ্যক এলিফ্যান্ট সিলের সম্ভাব্য মৃত্যুর আশঙ্কায় সেখানে কর্মরত গবেষক ও সহায়ক কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হলেও আক্রান্ত প্রাণীর কাছাকাছি দীর্ঘ সময় অবস্থানের কারণে তৈরি হতে পারে গুরুতর মনোসামাজিক ঝুঁকি।
তাসমানিয়া ও অ্যান্টার্কটিকার মাঝামাঝি দক্ষিণ মহাসাগরে অবস্থিত ম্যাককুয়ারি দ্বীপ অস্ট্রেলিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্র। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম অবস্থান এবং বিচ্ছিন্ন পরিবেশের কারণে দ্বীপটিতে বসবাস ও কাজ করা এমনিতেই অত্যন্ত কঠিন। এর ওপর যদি প্রজনন মৌসুমে বিপুলসংখ্যক সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তাহলে সেখানে কর্মরত মানুষের ওপর মানসিক ও সামাজিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি, পরিবেশ ও পানি বিষয়ক দপ্তরের উপসচিব শন সুলিভান জানিয়েছেন, মানুষের জন্য এইচ৫ বার্ড ফ্লুর সরাসরি ঝুঁকি কম বিবেচিত হলেও সম্ভাব্য বিপুলসংখ্যক আক্রান্ত প্রাণীর কাছাকাছি বসবাসের বিষয়টি উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে গবেষণাকেন্দ্রের কর্মীরা এমনিতেই বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গম ও কঠিন পরিবেশগুলোর একটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন করে প্রাণীর মৃত্যু, রোগের আশঙ্কা এবং বিচ্ছিন্ন পরিবেশে কাজের চাপ তাদের মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ম্যাককুয়ারি দ্বীপে থাকা ২৪ জন কারিগরি কর্মী, বিজ্ঞানী ও সহায়ক কর্মীকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবরের শুরুতে তাদের আরএসভি নুইনা আইসব্রেকারে করে দ্বীপটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে বলে অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
ম্যাককুয়ারি দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এলিফ্যান্ট সিল গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে সেখানে বিপুলসংখ্যক এই প্রাণীর সমাগম ঘটে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলা এ সময়ে প্রাণীগুলো একসঙ্গে অবস্থান করায় সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে এই সময়টিকে ঘিরেই কর্মকর্তাদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
এখন পর্যন্ত ম্যাককুয়ারি দ্বীপে এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লুর কোনো সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। তবে ভাইরাসটি বন্যপ্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে এলিফ্যান্ট সিলের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রজনন মৌসুমে বিপুলসংখ্যক প্রাণীর উপস্থিতির কারণে সম্ভাব্য সংক্রমণ ও মৃত্যুর মাত্রা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে দেশটির অন্য একটি দুর্গম ভূখণ্ডে এই ভাইরাসের ভয়াবহ প্রভাব দেখেছে। গত জুনে কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপপুঞ্জে বার্ড ফ্লুর সংক্রমণে হাজার হাজার এলিফ্যান্ট সিলের বাচ্চা মারা গেছে। ওই ঘটনার পর দেশের অন্যান্য দুর্গম দ্বীপ ও বন্যপ্রাণী অধ্যুষিত অঞ্চলেও ভাইরাসটির বিস্তার নিয়ে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।
এইচ৫ ভাইরাস সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পোলট্রি, বন্য পাখি এবং বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমণের ফলে বহু প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। বন্যপ্রাণীর মধ্যে ভাইরাসটির বিস্তার বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, কারণ বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে এর গতিপথ ও প্রভাব অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ সময় ধরে অস্ট্রেলিয়া ছিল বিশ্বের এমন একটি মহাদেশীয় ভূখণ্ড, যেখানে এইচ৫ ধরনের বার্ড ফ্লুর উপস্থিতি ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। শুক্রবার পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় এইচ৫ বার্ড ফ্লুর ৩৪১টি নিশ্চিত বা সম্ভাব্য পজিটিভ সংক্রমণের তথ্য জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে এখন পর্যন্ত দেশটির পোলট্রি খাত কিংবা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি।
কৃষি ও পোলট্রি খাতে ভাইরাসটির প্রবেশ ঠেকানো অস্ট্রেলিয়ার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটির খাদ্য সরবরাহ, পোলট্রি উৎপাদন এবং বাণিজ্যের ওপর এ ধরনের সংক্রমণের বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে বন্যপ্রাণী থেকে গৃহপালিত প্রাণী এবং কৃষি খাতে ভাইরাসের সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তবে ম্যাককুয়ারি দ্বীপের ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তের মূল কারণ শুধু সম্ভাব্য সংক্রমণ নয়। দুর্গম এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা কর্মীদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেখানে বড় আকারে প্রাণীর মৃত্যু শুরু হলে গবেষক ও কর্মীদের প্রতিদিন সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। পাশাপাশি রোগ নিয়ন্ত্রণ, মৃত প্রাণী ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বাড়তি দায়িত্বও তৈরি হতে পারে।
শন সুলিভানের বক্তব্যে বিষয়টির এই মানবিক দিকটি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, কর্মীদের নিরাপত্তা বলতে শুধু শারীরিক নিরাপত্তাকে বোঝালে হবে না; তাদের মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এমন একটি জায়গায়, যেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও জরুরি সহায়তার সুযোগ সীমিত, সেখানে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হলে তা কর্মীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণাকেন্দ্রের কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তাই সম্ভাব্য সংকটের আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্বীপে ভাইরাস শনাক্ত না হলেও পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পর দ্রুত কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার চেয়ে আগেভাগে ঝুঁকি কমিয়ে আনা নিরাপদ বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
ম্যাককুয়ারি দ্বীপের ঘটনাটি একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও মানবস্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এনেছে। একটি ভাইরাস কীভাবে পাখি থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং সেখান থেকে আরও বিস্তৃত পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা চলছে। অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম দ্বীপগুলোতে এলিফ্যান্ট সিলের মতো প্রাণীর মধ্যে সম্ভাব্য সংক্রমণ সেই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এখন ম্যাককুয়ারি দ্বীপের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রজনন মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বাড়বে এবং তখন ভাইরাসটির কোনো উপস্থিতি ধরা পড়ে কি না, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর পাশাপাশি দ্বীপ থেকে কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং গবেষণাকেন্দ্রের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সেদিকেও নজর রাখছে অস্ট্রেলিয়া কর্তৃপক্ষ।
প্রকৃতিতে কোনো সংক্রমণের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ম্যাককুয়ারি দ্বীপে এখনো এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু পাওয়া যায়নি। কিন্তু সম্ভাব্য বিপদের আকার, দ্বীপটির দুর্গমতা এবং বন্যপ্রাণীর ওপর ভাইরাসটির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে আগাম সতর্কতাই বেছে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
বিশেষজ্ঞদের জন্যও আগামী কয়েক মাস গুরুত্বপূর্ণ। এলিফ্যান্ট সিলের প্রজনন মৌসুমে ভাইরাসটির আচরণ, প্রাণীদের মধ্যে সম্ভাব্য সংক্রমণ এবং এর পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গবেষণা কার্যক্রম কীভাবে চালিয়ে যাওয়া যায়, সেটিও হয়ে উঠবে বড় চ্যালেঞ্জ। আপাতত তাই ম্যাককুয়ারি দ্বীপে সতর্ক নজরদারি এবং কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই অস্ট্রেলিয়ার প্রধান অগ্রাধিকার।