প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ কোরিয়া আগামী সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে ত্রিদেশীয় যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে যাচ্ছে। ‘ফ্রিডম এজ’ নামে বহুমাত্রিক এই মহড়া আগামী ৭ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অনুষ্ঠিত হবে। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই তিন দেশের এই সামরিক সহযোগিতার নতুন পর্ব সামনে এলো।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ (জেসিএস) শুক্রবার মহড়ার সময়সূচি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, এটি তিন দেশের নিয়মিত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক মহড়ার অংশ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এ মহড়ার প্রধান উদ্দেশ্য।
এবারের ‘ফ্রিডম এজ’ মহড়া বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার পৃথক একটি বড় সামরিক মহড়ার পরিধি কমিয়ে আনার পর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবারও সংলাপের পথ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়ার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়ার সময় ও পরিধি কমানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় সামরিক মহড়ায় যখন কিছুটা সংযম দেখা যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে জাপানকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিদেশীয় মহড়া চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘ফ্রিডম এজ’ হবে একটি বহুমাত্রিক মহড়া। এতে তিন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও আন্তঃকার্যক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তব সময়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবহার গুরুত্ব পাবে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবারের মহড়ায় বহুজাতিক নৌ ও বিমান সক্ষমতার ব্যবহার, উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা পরিস্থিতির অনুশীলন, আহত বা বিপদগ্রস্ত সদস্যদের চিকিৎসা ও সরিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ এবং সমুদ্রপথে তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এর আগে অনুষ্ঠিত ‘ফ্রিডম এজ’ মহড়াগুলোতেও সমুদ্রপথে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, আকাশ ও বিমান প্রতিরক্ষা, সাবমেরিনবিরোধী অভিযান এবং সাইবার প্রতিরক্ষার মতো বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এবারের মহড়ার পরিসর ও মাত্রা আগের আয়োজনগুলোর কাছাকাছি থাকবে বলে দক্ষিণ কোরিয়ার এক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ত্রিদেশীয় এই সামরিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০২৩ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নেতাদের ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলনের মাধ্যমে। ওই বৈঠকে তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুনে প্রথম ‘ফ্রিডম এজ’ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের নভেম্বরে দ্বিতীয় এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৃতীয় মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এবার চতুর্থবারের মতো এই আয়োজন হতে যাচ্ছে।
তিন দেশের সামরিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান কারণ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন। পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ফলে ওয়াশিংটন ও সিউল এসব মহড়াকে প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করলেও উত্তর কোরিয়ার দৃষ্টিতে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পিয়ংইয়ং এর আগে ‘ফ্রিডম এজ’সহ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিভিন্ন সামরিক মহড়ার সমালোচনা করেছে। উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের বক্তব্য, এ ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ায় এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের দাবি, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও পারমাণবিক সক্ষমতার বিকাশের কারণে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এবারের মহড়ার সময় নির্ধারণের বিষয়টিও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নতুন করে সংলাপ শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সময়ে তিনি দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় আকারের যৌথ সামরিক মহড়াকে ছোট করার নির্দেশ দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং দেশটি সামরিক মহড়া ও অস্ত্র সহযোগিতা নিয়ে ওয়াশিংটন ও সিউলের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে। ফলে একদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা এবং অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার এই দ্বৈত পরিস্থিতি কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, ‘ফ্রিডম এজ’ মহড়া শুধু উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতার ধারাবাহিকতাও তুলে ধরে। বিশেষ করে তথ্য বিনিময়, সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌ ও বিমান সক্ষমতার যৌথ ব্যবহারের মাধ্যমে তিন দেশ ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি যাচাই করতে চায়।
এদিকে এবারের মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন বড় সামরিক সম্পদ অংশ নেবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ২০২৫ সালের মহড়ায় প্রথমবারের মতো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অংশ নেয়নি। সে সময় মার্কিন নৌবাহিনীর বিভিন্ন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন ছিল। এবারও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার মাত্রা নিয়ে নজর থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বরে জেজু দ্বীপের আশপাশের আন্তর্জাতিক জলসীমায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘ফ্রিডম এজ’ মহড়া কোরীয় উপদ্বীপ ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেবে। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিপরীতে তিন মিত্র দেশের সমন্বিত সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি মহড়াটি ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে সামরিক নীতির ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।