প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হিমালয়ের দুর্গম ও বিপজ্জনক পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নেপাল ও তিব্বতজুড়ে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক পানির স্রোত, ভূমিধস এবং নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুই অঞ্চলে নিহতের সংখ্যা ৬৩১ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক স্থানে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শনিবার পাওয়া বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, নেপালে এ ভয়াবহ দুর্যোগে অন্তত ৬২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় এক হাজার ৯২৪ জন। অন্যদিকে তিব্বতে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৫৮ জন। সব মিলিয়ে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাহাড়ি ও নদীসংলগ্ন জনপদগুলো। হঠাৎ নেমে আসা প্রবল পানির স্রোত মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বহু মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বা স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই দুর্যোগের মুখে পড়েন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। অনেক পরিবার এখনো তাদের স্বজনদের কোনো খোঁজ পাচ্ছে না। কোথাও ধ্বংসস্তূপের নিচে, কোথাও নদীর স্রোতে কিংবা পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার সকালে হিমালয়ের প্রায় পাঁচ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি বিশাল হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ প্রায় এক হাজার ২০০ মিটার নিচে নেমে আসে। পরে এই বিপুল ধ্বংসাবশেষ লেন্দে নদীর দিকে আছড়ে পড়লে সৃষ্টি হয় ভয়ংকর পানির স্রোত।
প্রবল স্রোত ছড়িয়ে পড়ে নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায়। দুর্যোগের মাত্রা এতটাই আকস্মিক ছিল যে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা প্রায় নয় মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে জানা গেছে। পাহাড়ি নদীর পানির এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আশপাশের জনপদে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আগেই পানি ও ধ্বংসাবশেষ তাদের ঘরবাড়িতে আঘাত হানে।
প্রথম দিকে এই ঘটনার পেছনে ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। কারণ, হিমবাহ ধসের সময় ওই অঞ্চলে ভূকম্পনের মতো কম্পন শনাক্ত হয়। তবে পরবর্তী পর্যবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যে কম্পন শনাক্ত হয়েছিল তা ভূমিকম্পের কারণে নয়; বরং বিশাল হিমবাহ ধস এবং তার সঙ্গে সৃষ্ট ভূমিধসের ফলেই এ ধরনের কম্পন তৈরি হয়েছিল।
দুর্যোগের পর নতুন করে আরেকটি বড় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে হিমবাহ ধসের স্থানে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ। ধসের ফলে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই জলাধারে দ্রুত পানি জমতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সেখানে তৈরি হওয়া অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আরও ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। এই আশঙ্কায় একপর্যায়ে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।
পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর উদ্ধার তৎপরতা আবার শুরু করা হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে গেছে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নতুন তৈরি হওয়া হ্রদের পানি যে প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে আছে, সেটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। আলগা পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ জমে এই বাঁধ তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত পানির চাপ তৈরি হলে যেকোনো সময় সেটি ভেঙে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে নিরাপদ পরিস্থিতি হবে যদি হ্রদের পানি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিতভাবে বের হয়ে যেতে পারে। প্রয়োজনে প্রকৌশলগত পদ্ধতিতে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এমন কাজ অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। ভারত ও চীনের কাছে বিশেষজ্ঞ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, ধসে পড়া এলাকা এবং সুড়ঙ্গ বা বিচ্ছিন্ন স্থানে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধারে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুরুতে বড় আকারের বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণের বিষয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থানে ছিল নেপাল। কারণ, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক উদ্ধারকর্মী বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে চলমান কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠায় মানুষের জীবন রক্ষাকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারত, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস ফেডারেশন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
উদ্ধার কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থা। পাহাড়ি সড়কের বিভিন্ন অংশ ধসে গেছে, কোথাও সেতু ভেসে গেছে, আবার কোথাও কাদা ও পাথরের স্তূপে রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গত অনেক জনপদ কার্যত বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। হেলিকপ্টার ও বিশেষ যানবাহন ব্যবহার করেও সব এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দারা। অনেক পরিবার খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসাসেবার সংকটে রয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে মানুষ বিভিন্ন স্থানে অপেক্ষা করছেন। কোনো পরিবারের সদস্য ফিরবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটে যাচ্ছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত।
তিব্বতের গিরং এলাকায় দুর্যোগ পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। একই সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্ধার কার্যক্রম এবং হিমবাহজনিত ঝুঁকি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি হিমবাহের হ্রদগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং বৈজ্ঞানিকভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতি, জলবায়ুর পরিবর্তন, বরফ গলার হার এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক পরিবর্তন একসঙ্গে এমন দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে চলমান এই বিপর্যয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন নিখোঁজ মানুষদের জীবিত উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা।
উদ্ধারকাজ যত গভীরে পৌঁছাবে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র ততই স্পষ্ট হবে। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এখনো যেসব এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে বহু মানুষ আটকে থাকতে পারেন। ধ্বংসস্তূপ সরানো, নদীর স্রোত নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের।
নেপাল ও তিব্বতের এই বিপর্যয় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর নয়; এটি হাজারো পরিবারের অপেক্ষা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার গল্প। কেউ হারিয়েছেন পরিবারের সদস্য, কেউ এখনো নিখোঁজ স্বজনের ফেরার আশায় দিন গুনছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ঘরবাড়ি এবং ভেঙে যাওয়া সড়কের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে মানুষের জীবনে।
নিখোঁজদের সন্ধান, দুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং নতুন করে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক দিন নেপাল ও তিব্বতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন তৈরি হওয়া হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধের অবস্থা, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং পাহাড়ি নদীগুলোর পানির প্রবাহের ওপর এখন নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও প্রকৃতির এই ভয়ংকর বিপর্যয় কত মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে। তবে প্রতিটি উদ্ধার হওয়া মানুষের জীবন এখন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে, আর প্রতিটি নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর চোখে একটাই প্রত্যাশা—তাদের প্রিয়জন যেন কোনোভাবে ফিরে আসেন।