ইউরোপে দায়িত্ব বাড়াতে ন্যাটোকে চাপ যুক্তরাষ্ট্রের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
ইউরোপে দায়িত্ব বাড়াতে ন্যাটোকে চাপ যুক্তরাষ্ট্রের

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউরোপের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের আরও বড় দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইউরোপে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ভবিষ্যতে কতটা রাখা হবে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান ন্যাটোর দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা কাঠামোয় দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে নতুন আলোচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ৮০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য সামরিক হুমকি মোকাবিলায় এই মার্কিন উপস্থিতি ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন মনে করছে, ইউরোপের প্রচলিত প্রতিরক্ষার বড় অংশের দায়িত্ব ইউরোপীয় মিত্রদের নিজেদেরই নিতে হবে। প্রয়োজন হলে ওয়াশিংটন তাদের সহায়তা করবে।

এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশলগত অগ্রাধিকারও কাজ করছে। ওয়াশিংটন বর্তমানে নিজ দেশের আশপাশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে চাইছে। ফলে ইউরোপে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা দীর্ঘমেয়াদে মোতায়েন রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ন্যাটোর সদর দপ্তরে মিত্রদের সঙ্গে বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী এলব্রিজ কলবি ওয়াশিংটনের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জার্মানি, পোল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর প্রতিরক্ষা উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের অন্য মিত্রদের কাছ থেকেও আরও বড় ধরনের উদ্যোগ দেখতে চায়।

কলবি বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের কাছ থেকেও আরও বেশি দায়িত্ব গ্রহণের প্রত্যাশার কথা জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ন্যাটোকে এমন একটি কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়া, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম।

ন্যাটোর সামরিক দায়িত্ব আরও ভারসাম্যপূর্ণভাবে ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টিকে ওয়াশিংটন এখন গুরুত্ব দিচ্ছে। এতদিন ইউরোপীয় নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ছিল জোটের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা, উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, বিমান ও নৌ সক্ষমতা এবং গোয়েন্দা সহায়তার ওপর ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কাঠামো অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল। নতুন মার্কিন নীতিতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও দ্রুত বাড়াতে হবে।

এই অবস্থান কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ন্যাটোর বিভিন্ন মিত্র দেশের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে একটি প্রশ্নপত্র পাঠিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। সেখানে দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা উদ্যোগ এবং জোটের দায়িত্ব ভাগাভাগিতে তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

শুধু সামরিক সক্ষমতার তথ্যই নয়, মিত্র দেশগুলোর ঘাঁটি ও আকাশসীমায় মার্কিন বাহিনীর প্রবেশাধিকার নিয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হলে মার্কিন বাহিনী যেন ইউরোপীয় মিত্রদের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা দ্রুত ব্যবহার করতে পারে, সে বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি ও নিশ্চয়তা চাচ্ছে ওয়াশিংটন।

প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী কলবি জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে প্রশ্নপত্রের উত্তর দিয়েছে। তবে কোন কোন দেশ উত্তর দিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি। এসব উত্তর পর্যালোচনার পর ইউরোপে মার্কিন সামরিক অবস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

এখানে পারমাণবিক প্রতিরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী ইউরোপীয় মিত্ররা প্রচলিত প্রতিরক্ষায় আরও বড় দায়িত্ব নিলেও পারমাণবিক প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বজায় থাকবে। ফলে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা ইউরোপ থেকে পুরোপুরি সামরিকভাবে সরে যাওয়ার কোনো ঘোষণা নয়; বরং দায়িত্বের ধরন ও পরিমাণ নতুনভাবে নির্ধারণের একটি প্রচেষ্টা।

ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চলছে। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউরোপীয় মিত্ররা নিজেদের সামরিক সক্ষমতার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠুক।

ওয়াশিংটনের এই অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। চীনকে কেন্দ্র করে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। এই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি ও সক্ষমতা জোরদার করতে হলে ইউরোপে মোতায়েন করা সামরিক সম্পদের একটি অংশ পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ইউরোপে দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বৈশ্বিক কৌশলের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।

এদিকে ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনাও ন্যাটোর সদস্যদের জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার বিষয়টি ইউরোপেরও স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের সামরিক পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র যাতে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করতে পারে, সে জন্য মিত্রদের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়টি আগে থেকেই পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর সময় ইউরোপের কয়েকটি দেশকে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। কারণ ওয়াশিংটন মিত্রদের সঙ্গে আগাম আলোচনা না করেই অভিযান শুরু করেছিল। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে সামরিক সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

বর্তমান উদ্যোগ সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতের সামরিক কার্যক্রম আরও পূর্বপরিকল্পিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, কোনো সংকট তৈরি হলে প্রয়োজনীয় সামরিক অবকাঠামো, ঘাঁটি ও আকাশপথ ব্যবহারের বিষয়ে যেন শেষ মুহূর্তে অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।

তবে ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর সিদ্ধান্ত ন্যাটোর জন্য কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা, বিমান প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত পরিবহন ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়। বিশেষ করে রাশিয়ার মতো সামরিক শক্তির মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলোর সমন্বিত সক্ষমতা কত দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে, সেটি বড় প্রশ্ন।

অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্যও এই পরিবর্তন একটি সুযোগ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার যে সমালোচনা রয়েছে, নতুন পরিস্থিতি তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প, সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানোর চাপ তৈরি করবে।

সব মিলিয়ে, ন্যাটোর সামরিক কাঠামোয় দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চাপ জোটটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউরোপে মার্কিন সেনার সংখ্যা শেষ পর্যন্ত কতটা কমবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে ওয়াশিংটনের বার্তা স্পষ্ট—ইউরোপীয় মিত্রদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বড় দায়িত্ব নিতে হবে, আর যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিকসহ বিশ্বের অন্যান্য কৌশলগত অঞ্চলে নিজেদের মনোযোগ বাড়াতে চায়।

এই পরিবর্তনের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা দায়িত্বের নতুন কাঠামো কতটা সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর। ন্যাটোর শক্তি দীর্ঘদিন ধরে জোটের সদস্যদের সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতা ও পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই নতুন ভারসাম্য তৈরির পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমলেও ইউরোপের নিরাপত্তা যেন দুর্বল না হয় এবং জোটের ঐক্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত