প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যে অঞ্চলে তেল বিক্রি করতে পারবে না, সেখানে অন্য কোনো দেশকেও তেল বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় গালিবাফ এ হুঁশিয়ারি দেন। তাঁর বক্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার দাবি করেছে। ফলে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।
গালিবাফ তাঁর বক্তব্যে ইরানের অবস্থানকে স্পষ্ট করে বলেন, চলমান সংঘাতের ক্ষেত্রে তেহরানের নীতি হবে ‘হয় সব, নয়তো কেউই নয়’। অর্থাৎ ইরান যদি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে তেল বিক্রি করতে না পারে, তাহলে সেই অঞ্চলে অন্য দেশগুলোর তেল রপ্তানিও বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তাঁর এই বক্তব্য মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কৌশলগত গুরুত্ব এবং জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে দেশটির প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই সরু জলপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট তেল চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে কোনো কারণে প্রণালিটির স্বাভাবিক নৌ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি বাজারেও এর প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।
গালিবাফ একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি থাকা যাবে না। তিনি বলেছেন, ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো অবকাঠামোকেই নিরাপদ বলে বিবেচনা করা যাবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা মার্কিন বাহিনীর অনুপস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার আরও বলেছেন, যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালিতে যে পরিস্থিতি ছিল, তা আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। তাঁর এই মন্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তেহরান ভবিষ্যতে এই জলপথের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। তবে ইরানের এই অবস্থান বাস্তবে কী ধরনের পদক্ষেপে রূপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিজেদের অবস্থান জোরালো করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী প্রণালিটির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের এই দাবি এবং তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার অর্থ হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া। বিশ্বের অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে। ফলে প্রণালির মাধ্যমে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য সরবরাহ ও ব্যয়—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি বাজারে এমন অনিশ্চয়তার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব সাধারণত অপরিশোধিত তেলের দামে দেখা যায়। সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও এসে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু তেল পরিবহনের কারণে নয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি পরিবহনপথ হিসেবেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জলপথটিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে তেল ছাড়াও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতের ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ইরানের জন্যও হরমুজ প্রণালি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বড় একটি অংশের বাণিজ্য ও জ্বালানি রপ্তানির সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগ জড়িত। তাই প্রণালিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে তেহরানের আপত্তি নতুন নয়। তবে বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গালিবাফের বক্তব্য আগের তুলনায় আরও কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাঁর ‘সব অথবা কেউই নয়’ অবস্থান মূলত একটি কৌশলগত বার্তা বহন করছে। ইরান যদি নিজস্ব তেল রপ্তানিতে বাধার মুখে পড়ে, তাহলে একই অঞ্চলের অন্য তেল উৎপাদকদের স্বাভাবিক রপ্তানিও যাতে অব্যাহত না থাকে, সে বিষয়ে তেহরান কঠোর অবস্থান নিতে পারে—এমন ইঙ্গিত রয়েছে তাঁর বক্তব্যে। বাস্তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি আমদানিকারকদের ওপরও বড় ধরনের চাপ পড়তে পারে।
তবে গালিবাফের বক্তব্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানও পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওয়াশিংটন যদি হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করে এবং তেহরান যদি সেখানে মার্কিন উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সংঘাতটি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সাময়িক উত্তেজনা ও দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার অর্থনৈতিক প্রভাব এক নয়। কয়েক দিনের সরবরাহ বিঘ্ন বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ভারসাম্য বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
এ কারণে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে শুধু একটি রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার প্রশ্নও জড়িত। এখন নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরবর্তী সময়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক থাকে তার ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ঘিরে পরিস্থিতি যদি আরও অবনতির দিকে যায়, তাহলে তার ঢেউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে। আর যদি কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তাই গালিবাফের কঠোর হুঁশিয়ারির পর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।