প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ৬৪ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সরকারি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে সরকার। ২৭ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনের পর থেকেই এই দায়িত্বের কার্যকারিতা, সীমা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই দায়িত্ব মূলত তদারকি, সমন্বয় ও পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপরা জেলার সরকারি দপ্তরগুলোকে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুতর অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন। পাশাপাশি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির অগ্রগতি তদারক করবেন। প্রয়োজন হলে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়ে পরামর্শও দিতে পারবেন।
প্রজ্ঞাপনে একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে, দায়িত্ব পালনের সময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার আইনগত ক্ষমতা খর্ব করা যাবে না। সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ এবং রুলস অব বিজনেসের সংশ্লিষ্ট বিধানের ভিত্তিতে সরকার এই দায়িত্ব বণ্টন করেছে। প্রজ্ঞাপনে ২০০৩ সালের একটি হাইকোর্টের রিট মামলার রায়ের কথাও উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টন সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।
কাগজে-কলমে বিষয়টি তদারকি ও সমন্বয়ের হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ কীভাবে হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ একটি জেলার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যেকেরই নিজস্ব আইনগত ও সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। নতুন করে একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে জেলার সার্বিক সরকারি কর্মকাণ্ড তদারকির দায়িত্ব দেওয়ায় দায়িত্বের সীমারেখা পরিষ্কার না থাকলে সমন্বয়ের পরিবর্তে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে যেসব জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দলের সংসদ সদস্য নেই, সেখানে রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও জটিল হতে পারে। বর্তমান সংসদে বিভিন্ন জেলায় বিরোধী দলের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পাওয়া কোনো মন্ত্রী যদি জেলার উন্নয়ন বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন, তখন স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর ভূমিকার সমন্বয় কীভাবে হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই প্রশ্নের আরেকটি দিক হলো, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব আসলে কী হবে। একজন সংসদ সদস্যের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁরা জনগণের প্রয়োজন ও সমস্যা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেন। কিন্তু জেলার সরকারি কার্যক্রমের তদারকির জন্য আলাদা করে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পাওয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্যরা তাঁদের ভূমিকা কীভাবে পালন করবেন—এটি এখন রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয়।
সরকারের প্রজ্ঞাপনে অবশ্য স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা খর্ব করার কোনো কথা বলা হয়নি। বরং স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনগত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে জেলার রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে নয়, বরং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে হবে—এমনটাই প্রজ্ঞাপনের ভাষা থেকে বোঝা যায়।
এবার ৬৪ জেলার দায়িত্ব ৩০ জনের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। কেউ একটি জেলা, আবার কেউ দুই বা তিনটি জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন। রাজশাহী ও নাটোরের দায়িত্ব পেয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। লালমনিরহাট, নীলফামারী ও পঞ্চগড়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনকে। লক্ষ্মীপুরের দায়িত্ব পেয়েছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু। চুয়াডাঙ্গার দায়িত্ব পেয়েছেন নিতাই রায় চৌধুরী। সিলেট ও সুনামগঞ্জের দায়িত্ব পেয়েছেন জি কে গউছ।
ঢাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুকে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব পেয়েছেন হাবিবুর রশিদ। মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের দায়িত্ব পেয়েছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদকে। চট্টগ্রামের দায়িত্ব পেয়েছেন মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী।
উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্বও ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের দায়িত্ব পেয়েছেন আব্দুল বারী। রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মীর শাহে আলমকে। ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের দায়িত্ব পেয়েছেন আসাদুল হাবিব দুলু। যশোর, মাগুরা ও নড়াইলের দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ ফরিদুল ইসলাম। আর মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের দায়িত্ব পেয়েছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এই দায়িত্ব বণ্টনের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। কয়েকটি জেলায় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য নেই এবং সেখানে বিরোধী দলের প্রভাব রয়েছে। ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা। কোনো জেলার সংসদ সদস্য যদি মনে করেন তাঁর নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন বা প্রশাসনিক বিষয়ে বাইরের কোনো রাজনৈতিক নেতা অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছেন, তাহলে সেখানে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের যদি কেবল আনুষ্ঠানিক সমন্বয়কের ভূমিকায় রাখা হয় এবং তাঁদের পরামর্শ বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকে, তাহলে এই ব্যবস্থা কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলও দিতে পারে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি, দুর্নীতির অভিযোগ, মাদক ও চোরাচালান এবং জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের যোগাযোগ দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা এই ব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্নও রেখে গেছে। এর আগে মন্ত্রীদের নির্দিষ্ট জেলার দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক হয়েছিল। ২০০৩ সালে জাতীয় পার্টির নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। ২০২৬ সালের নতুন প্রজ্ঞাপনে অবশ্য সরকার ওই মামলার রায়ের উল্লেখ করে বলেছে, নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমার মধ্যে এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টন সরকারের এখতিয়ারভুক্ত।
এবারের ব্যবস্থায় তাই অতীতের তুলনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ক্ষমতার সীমারেখা। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কোথায় পরামর্শ দেবেন, কোথায় সমন্বয় করবেন এবং কোথায় থামবেন—তা স্পষ্ট থাকা জরুরি। একইভাবে জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ আইনগত ভূমিকা যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে যে আশঙ্কাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো তদারকির নামে যদি রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সমন্বয়ের বদলে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। আবার দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে জেলার মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেন, তাহলে এই ব্যবস্থাকে প্রশাসনিক সমন্বয়ের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে এই ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে একটি সহজ প্রশ্নের ওপর—জেলায় সরকারি সেবা কি দ্রুত হবে, দুর্নীতি কি কমবে, আইনশৃঙ্খলা কি উন্নত হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের স্বার্থ কি বেশি গুরুত্ব পাবে? মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের নতুন দায়িত্ব যদি এসব ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে উদ্যোগটির প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হবে। আর যদি দায়িত্বের কারণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে নতুন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তাহলে তা সরকারের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এখন তাই নজর থাকবে মাঠপর্যায়ে। কাগজে দায়িত্বটি তদারকি ও সমন্বয়ের; বাস্তবে এটি কতটা জনস্বার্থকেন্দ্রিক এবং কতটা রাজনৈতিক কর্তৃত্বমুক্ত থাকে, তার ওপরই নির্ভর করবে ৬৪ জেলার এই নতুন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।