জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব আইরিন জুবাইদা খান জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে শুক্রবার তাঁর নতুন দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কর্মজীবনে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক আইন, শরণার্থী সুরক্ষা, আইনের শাসন এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছেন আইরিন খান। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জাতিসংঘ মিশনের নেতৃত্বে তাঁর নিয়োগকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঢাকায় শনিবার পাওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করার পর আইরিন খান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেন। নতুন দায়িত্বে তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবেন।

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, শরণার্থী সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিভিন্ন বিষয়ে জাতিসংঘের আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে হয়। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য এসব আন্তর্জাতিক আলোচনায় কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

আইরিন খানের আন্তর্জাতিক পরিচিতির বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে মানবাধিকার নিয়ে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে। তিনি ২০২০ সাল থেকে মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষা ও প্রসারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ দায়িত্বে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত বিষয় পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আইরিন খান। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম নারী মহাসচিব। এই দায়িত্বে থাকাকালে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নেতৃত্ব দেওয়ার আগে এবং পরে আন্তর্জাতিক আইন ও উন্নয়ন নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল’ অর্গানাইজেশনের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

জাতিসংঘ ব্যবস্থায়ও তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ে প্রায় ২১ বছর কাজ করেছেন আইরিন খান। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ভারতে ইউএনএইচসিআরের চিফ অব মিশন এবং ডিভিশন অব ইন্টারন্যাশনাল প্রটেকশনের উপ-পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

শরণার্থী সুরক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এই সংকট মোকাবিলা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন দায়িত্বে আইরিন খানের শরণার্থী ও মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞতা এ ধরনের আন্তর্জাতিক আলোচনায় অতিরিক্ত মূল্য যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মানবাধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ২০০৬ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ সিডনি পিস প্রাইজ লাভ করেন। মানবাধিকার রক্ষা ও শান্তির পক্ষে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার তাঁর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

আইরিন খান একজন লেখকও। তাঁর লেখা ‘দ্য আনহার্ড ট্রুথ: পভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ গ্রন্থে দারিদ্র্য ও মানবাধিকারের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তাঁর একাডেমিক পটভূমিও আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে সমৃদ্ধ। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার এবং হার্ভার্ড ল’ স্কুলে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হলো। এতদিন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে যিনি বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কাজ করেছেন, এবার তাঁকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও স্বার্থ তুলে ধরতে হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চে।

এই দায়িত্বে তাঁর সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, রোহিঙ্গা সংকট, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং টেকসই উন্নয়ন—এসব বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বহুপাক্ষিক আলোচনায় তুলে ধরাও হবে তাঁর দায়িত্বের অন্যতম অংশ।

বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘের মঞ্চে একটি দেশের প্রতিনিধির ব্যক্তিগত কূটনৈতিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় আইরিন খান সেই জায়গায় একটি শক্তিশালী পেশাগত ভিত্তি নিয়ে দায়িত্ব শুরু করছেন।

তাঁর নিয়োগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের মতো বিষয়গুলোতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে একজন ব্যক্তির বাংলাদেশের জাতিসংঘ মিশনের নেতৃত্বে আসা। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতি ও অবস্থান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নতুন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হতে পারে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন তাঁর সামনে বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার বড় দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটে দেশের অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আইরিন খানের নতুন দায়িত্ব তাই শুধু একটি কূটনৈতিক পদে পরিবর্তন নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির সমন্বয়ে নতুন সম্ভাবনারও সূচনা। তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান করতে কতটা ভূমিকা রাখে, ভবিষ্যতের কর্মকাণ্ডেই তার প্রতিফলন দেখা যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত