প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ফিলিপের বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অতীতের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার গুম, নির্যাতন ও দমনপীড়নের অভিযোগ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন সংসদ সদস্য আইপিইউর কাছে চিঠি দিয়ে দেশে ফিরতে না পারা, রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছেন। এর বিপরীতে বর্তমান সংসদের সদস্যরা আইপিইউ প্রতিনিধিদের কাছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়গুলো তুলে ধরছেন।
আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ফিলিপ গত রোববার রাতে বাংলাদেশ সফরে আসেন। তার সফরকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদের সদস্যদের সঙ্গে একাধিক প্রস্তুতি ও মতবিনিময় বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং অতীতের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে আইপিইউর কাছে পাঠানো একাধিক চিঠিতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তারা দেশে ফিরে আসার সুযোগ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রগতি হয়েছিল বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।
তবে বর্তমান সংসদের বিভিন্ন সদস্য এসব বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে আইপিইউ প্রতিনিধিদলের কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছেন। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হয়রানি, গুম ও দমনপীড়নের অভিযোগ ছিল। এসব ঘটনার প্রভাব দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পড়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।
প্রস্তুতি বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন সংসদ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ও ওই সময়কার সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা বলেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সংসদ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যান্ডা ফিলিপ আইপিইউর সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে সংস্থাটির সঙ্গে কাজ করেছেন। ফলে বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তার পরিচিতি ও যোগাযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ সেই সূত্রে আইপিইউর কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বর্তমান সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে আইপিইউ প্রতিনিধিদের কাছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার হত্যা, গুম, রাজনৈতিক নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যাখ্যা রয়েছে।
সোমবার সকালে আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ফিলিপ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে স্পিকার বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদন আইপিইউ প্রতিনিধিদলের কাছে হস্তান্তর করেন।
স্পিকার ওই প্রতিবেদনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এটি জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্বাধীন তদন্তের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে এবং জাতীয় সংসদ এর প্রণয়ন বা প্রকাশে কোনো ভূমিকা রাখেনি। তিনি আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রতিনিধিদলকে প্রতিবেদনটি পর্যালোচনার অনুরোধ জানান।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। স্পিকার ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন এবং বলেন, ওই সময় দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
পরে আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে নারী ও তরুণ সংসদ সদস্যদের মতবিনিময় সভাতেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারী কয়েকজন সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজেদের বা পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন।
এদিকে সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনসিপির সংসদ সদস্য ও দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আইপিইউর কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগের সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম, হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ চিঠিগুলোতে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
আখতার হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, আইপিইউ প্রতিনিধিদলের কাছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রনেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের নেতাকর্মীরা অতীতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতার কিছু তথ্য প্রতিনিধিদলের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারকে সরাসরি দায়ী করার অভিযোগ তোলা হয়নি, তবে বাংলাদেশ ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা হয়েছে বলে তার মনে হয়েছে।
আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেলের সফরকে ঘিরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। সোমবার বিকালে তিনি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। সেখানে আন্দোলন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিভিন্ন দমনপীড়নের অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য ও ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেলের মতবিনিময়ের কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে অতীতে গুম ও রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপির সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরীসহ কয়েকজনকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গুমের শিকার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী এবং গুমের শিকার বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলিসহ আরও কয়েকজন প্রতিনিধির উপস্থিতির বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্যও বৈঠকে অংশ নিতে পারেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারের সদস্যরা অতীতের রাজনৈতিক নির্যাতন, গুম ও হয়রানির অভিযোগগুলো আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেলের সামনে তুলে ধরবেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন দিক আন্তর্জাতিক সংসদীয় প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে সফরের অংশ হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন অ্যান্ডা ফিলিপ। তাদের আলোচনায় জাতীয় সংসদকে আরও কার্যকর করা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা ও সংলাপের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সংসদকে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বিরোধীদলীয় নেতা সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে বিরোধী দলের ভূমিকা এবং সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে কার্যকর ও সমতাভিত্তিক অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক জবাবদিহি এবং সংসদে অর্থবহ বিতর্কের গুরুত্ব নিয়েও মতবিনিময় হয়।
আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেলের বাংলাদেশ সফরের এই পর্যায়ে দেশের রাজনৈতিক অতীত ও বর্তমান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের পাঠানো চিঠি এবং বর্তমান সংসদ সদস্যদের পাল্টা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংসদীয় অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের সফর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি দেশের সংসদীয় কাঠামো, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। তাই বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তথ্য ও যাচাইযোগ্য ঘটনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।