প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। জনগণের ভোটে সরকার গঠনের পর দেশকে এগিয়ে নিতে উন্নয়ন, উৎপাদন এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। তবে এই পথ সহজ নয়। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ, ষড়যন্ত্র ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এসব বাধা মোকাবিলা করেই দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বিএনপির এই নেতা।
মঙ্গলবার সকালে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রুহুল কবির রিজভী। এ সময় তিনি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বর্তমান সরকারের সামনে থাকা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে বক্তব্য দেন।
রিজভী বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের জন্য জনগণের আস্থা অর্জনই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিএনপি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় জনগণের অধিকার, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আন্দোলন করে এসেছে। বিভিন্ন সময় দলটির নেতাকর্মীরা নিপীড়ন, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। তারপরও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে বিএনপি সরে যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর এখন দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব সামনে এসেছে। শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং জনসেবার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা জরুরি। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার বিভিন্ন খাতে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, একটি দেশকে এগিয়ে নিতে গেলে শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই যথেষ্ট নয়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের সংকট ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সরকার পরিচালনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীলতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করাই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির রাজনীতির ইতিহাস নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করার ইতিহাস। দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে নানা চাপ, নিপীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশ ও দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তির পাশাপাশি নানা রাজনৈতিক চক্রান্তের মাধ্যমে বিএনপি এবং খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রিজভী।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বারবার বাধার মুখোমুখি হলেও খালেদা জিয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে পিছিয়ে যাননি। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে সামনে রেখে বেগম খালেদা জিয়া তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছেন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
রিজভী বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রাম একসময় ব্যাপক গণআন্দোলনের রূপ নেয়। মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে রাজপথে যে জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছিল, তা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অবদানও স্মরণ করেন রিজভী। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ধারণাকে সামনে রেখে বিএনপি তার রাজনৈতিক পথচলা অব্যাহত রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও কথা বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
রিজভীর মতে, সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বসে নেই। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। দেশে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলেও সেগুলো মোকাবিলা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য নির্ধারিত বাজেটের পাশাপাশি গ্যাস সংকট সমাধানেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
মহেশখালী এলাকায় অবস্থিত জ্বালানি অবকাঠামো ও টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির বিষয়েও কথা বলেন রিজভী। তিনি জানান, সেখানে যে কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কারিগরি জটিলতা দ্রুত নিরসন করা না গেলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়তে পারে। তবে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে তিনি দাবি করেন।
জ্বালানি খাতের সংকট শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বিদ্যুতের ঘাটতি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ভোগান্তি বাড়ে। এ কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রিজভী বলেন, সংকট ও চ্যালেঞ্জ থাকলেও দেশের অগ্রযাত্রা থেমে থাকতে পারে না। সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সরকারকে দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে তিনি দলের নেতাকর্মীদেরও অতীতের রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করাই ভবিষ্যতের বড় দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে দলের অতীত সংগ্রামের পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে জনগণের প্রত্যাশা, উন্নয়ন কার্যক্রম, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দেশের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর প্রশাসন এবং জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও বিভিন্ন মহল মনে করছে। একটি দেশের উন্নয়ন কেবল সরকারের একক উদ্যোগে সম্ভব নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক শক্তি, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, প্রতিকূলতা যতই থাকুক, জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য থেকে সরে আসা যাবে না। উন্নয়ন ও জনকল্যাণের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংকট মোকাবিলার মধ্য দিয়েই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলবে বলে তিনি জানান।
বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক যাত্রাপথের এই মুহূর্তে দলটির সামনে যেমন নতুন দায়িত্ব এসেছে, তেমনি সরকারের সামনে এসেছে মানুষের প্রত্যাশা পূরণের বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হয়, সেটিই আগামী দিনে দেশের মানুষ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।