গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬৮ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এখন আর শুধু শিল্পকারখানা কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে খাদ্য, ভোগ্যপণ্য, পোলট্রি, নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে খরচ বাড়ছে। এর সরাসরি চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। মগবাজারে এক লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা ১৫-২০ দিন আগেও ছিল প্রায় ১৮০ টাকা। কারওয়ান বাজারে চিনির দামও কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১৩০ টাকায় উঠেছে।

ভোক্তাদের অভিযোগ, গত কয়েক সপ্তাহে চাল ছাড়া অনেক নিত্যপণ্যের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে জ্বালানি খরচ বাড়ায় ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পরিবেশকেরা এক দিনের ব্যবধানেই ৫০ কেজি চিনির বস্তার দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। ফলে খুচরা পর্যায়েও দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে।

গ্যাস সংকটের কারণে পরিবহন খাতেও বাড়ছে ব্যয়। রাজধানীতে সিএনজি অটোরিকশাচালকদের অনেকেই দীর্ঘ সময় গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। এতে দৈনিক কার্যকর কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় কেউ কেউ বেশি ভাড়া দাবি করছেন।

জ্বালানি সংকটে ভোজ্যতেল ও খাদ্যপণ্য

জুলাইয়ের শেষ দিকে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটির কার্যক্রম কয়েক সপ্তাহ বন্ধ ছিল। এতে দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন শিল্পকারখানায় লোডশেডিং ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। উৎপাদন কমে গেলে একই সঙ্গে কারখানার ইউনিটপ্রতি ব্যয়ও বেড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে পড়ছে।

সরকার গত ২৯ এপ্রিল প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮০ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। তবে বাজারের কিছু অংশে খোলা সয়াবিন তেল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাম তেলের দামও সরকার নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কিছুটা বেশি।

রিফাইনাররা অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কথা অস্বীকার করেছে। সিটি গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে এক সপ্তাহে প্রতি টন সয়াবিনের দাম প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ডলার বেড়েছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি সংকটে পরিচালন ব্যয় ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেড়েছে।

আটা ও ময়দার বাজারেও চাপ রয়েছে। বর্তমানে খোলা আটা কেজিতে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা ময়দার দাম ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

ডালের দাম ধরনভেদে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধের দামও কেজিতে ২০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এ ছাড়া গত দুই মাসে পোলাও চালের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বিদ্যুৎ সংকটে পোলট্রি উৎপাদন

লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে পোলট্রি খাতেও। প্রায় ১৫ দিন আগে ঢাকায় এক ডজন ডিম ১৩০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় উঠেছে। ব্রয়লার মুরগির দামও কেজিতে প্রায় ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন জানান, ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের জন্য হ্যাচারিতে টানা ২১ দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন সচল রাখতে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ডিজেল ব্যয় বেড়ে উৎপাদন খরচও বাড়ছে।

তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে খামারে মুরগির মৃত্যুহারও বেড়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

ছোট হচ্ছে প্যাকেট, বাড়ছে কার্যকর দাম

জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় কিছু কোম্পানি পণ্যের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি প্যাকেটের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে একই দামে ভোক্তারা আগের তুলনায় কম পণ্য পাচ্ছেন।

প্রায় এক মাস আগে ৩০০ গ্রামের ভিম বার ৪০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ওজন কমিয়ে ২৭৫ গ্রাম করা হয়েছে, কিন্তু দাম একই রাখা হয়েছে। একইভাবে ২০০ গ্রামের প্যারাসুট তেলের বোতলের পরিমাণ কমিয়ে ১৯০ গ্রাম করা হলেও দাম ২০ টাকা বেড়েছে।

ডিটারজেন্টের দামও বেড়েছে। হুইল পাউডারের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১৬৫ টাকা এবং রিনের দাম ১৫ টাকা বেড়ে ১৯৫ টাকা হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের মতে, কয়েকটি সাবান ও বিস্কুটের ব্র্যান্ডও প্যাকেটের আকার ছোট করেছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিও কোম্পানিগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

শিল্প উৎপাদন কমায় বাড়ছে ইউনিটপ্রতি ব্যয়

গ্যাস সংকটে ৯০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তৈরি পোশাক, ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিক খাতের অনেক কারখানাও সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে।

ইস্পাত শিল্পে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো নির্ধারিত ব্যয় মোট উৎপাদনের তুলনায় বেশি হয়ে পড়ছে। রতনপুর স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুমন চৌধুরীর মতে, বর্তমানে প্রতি টন রডে উৎপাদনকারীদের ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।

সিমেন্ট খাতেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত এক মাসে সিমেন্ট উৎপাদনের ব্যয় অন্তত ১০ শতাংশ বেড়েছে। প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভারী যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় উৎপাদন স্বাভাবিক করতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্পও গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

সব মিলিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এখন সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে বাজারে। ব্যবসায়ীদের জন্য এটি উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ বাড়াচ্ছে, আর ভোক্তাদের জন্য এর অর্থ হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বাড়তি খরচ এবং সংসারের বাজেটে আরও চাপ।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com