প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবার পরিধি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফ্রিল্যান্সার, ব্যবসায়ী, ভ্রমণকারী ও চিকিৎসাসেবাগ্রহীতাদের বৈধভাবে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ দিতে সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু নীতিগত শিথিলতা আনা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষিত পেপ্যালের বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত ১৫ দিনে বাংলাদেশ ব্যাংক বহির্মুখী বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত তিনটি সার্কুলার জারি করেছে। এর মধ্যে ২৯ জুলাই চালু হওয়া নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই কাঠামোর আওতায় দেশের ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ‘ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট’ বা ডিভিএ নামে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব চালুর সুযোগ পাবে।
এই ব্যবস্থায় গ্রাহকেরা স্থানীয় ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা ধারণ ও লেনদেন নিষ্পত্তি করতে পারবেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ফ্রিল্যান্সারদের আয় দেশে আনার পাশাপাশি বিদেশে বিভিন্ন বৈধ খরচ পরিশোধের সুযোগও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেপ্যালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জবাবে পেপ্যাল জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পর্যালোচনা করছে।
একই সময়ে কয়েকটি দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকও পেপ্যাল, গুগল ওয়ালেট, ওয়াইজ ও পেওনিয়ারের মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবাদাতাদের সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। ফলে শুধু পেপ্যাল নয়, একাধিক বৈশ্বিক ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের জন্য বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফ্রিল্যান্সিং আয়ে নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য দেশের বিপুল ফ্রিল্যান্সিং খাতকে আরও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, আন্তর্জাতিক সেবার ক্ষেত্রে বর্তমানে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন হলেও অনানুষ্ঠানিক ফ্রিল্যান্সিং আয়, বিদেশ ভ্রমণ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্যয় মিলিয়ে সম্ভাব্য বাজারের আকার ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিদেশ ভ্রমণে বছরে প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। নতুন ব্যবস্থায় ইনওয়ার্ড ও আউটওয়ার্ড—দুই ধরনের বৈদেশিক লেনদেনের সুযোগ থাকায় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের বাজার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ডলার ওয়ালেট চালু হলে বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রে লেনদেনের স্বচ্ছতা ও আনুষ্ঠানিকতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ভ্রমণ ও চিকিৎসা ব্যয়েও সুবিধা
নতুন নীতিমালার প্রভাব শুধু ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যবসায়িক কার্যক্রম, শিক্ষা, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সেবা, চিকিৎসা এবং বিদেশ ভ্রমণের নির্দিষ্ট খরচ পরিশোধেও ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
ব্যক্তিগত ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত বার্ষিক ১২ হাজার ডলারের কোটার পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিবার সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয়ের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় ট্যুর অপারেটরদের বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজ বিক্রির ক্ষেত্রেও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে এতদিন অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হওয়া কিছু আন্তর্জাতিক লেনদেনকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পেপ্যালের বাংলাদেশে আসার পথে বাধা কোথায়?
বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল বাধা বাংলাদেশের নীতিগত কাঠামো নয়; বরং পেপ্যালের নিজস্ব ব্যবসায়িক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী এবং বেসিসের সাবেক সভাপতি এ কে এম ফাহিম মাশরুরের বক্তব্য অনুযায়ী, পেপ্যালের প্রতিনিধিরা ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন এবং তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে কিছু আইনি জটিলতা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০১৪ সালে উদীয়মান বাজারে সম্প্রসারণের কৌশল পরিবর্তনের কারণে পেপ্যাল তাদের পরিকল্পনা স্থগিত করে।
পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। ২০২৪ সালের পর যোগাযোগ জোরদার হয় এবং ২০২৫ সালে পেপ্যালের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় সফর করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক ও বাজার পরিস্থিতির কারণে সেই প্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়নি।
মাশরুরের মতে, বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর ক্ষেত্রে বড় কোনো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নেই। বরং বিষয়টি পেপ্যালের নিজস্ব ব্যবসায়িক কৌশল ও বাজার সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
ব্যাংকগুলোও দেখছে নতুন সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ডিভিএ কাঠামো বাস্তবায়নে দেশীয় ব্যাংকগুলোকেও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে চুক্তিতে যেতে হবে। ফলে এখন ব্যাংকগুলো সম্ভাব্য অংশীদার, পণ্য কাঠামো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, নতুন নীতিমালার অধীনে কী ধরনের পণ্য চালু করা সম্ভব এবং আন্তর্জাতিক ওয়ালেট সেবাদাতাদের সঙ্গে কীভাবে চুক্তি করা যায়, তা নিয়ে ব্যাংকগুলো প্রাথমিকভাবে কাজ করছে।
তবে পেপ্যাল বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অংশীদারত্ব করলেই যে সব ধরনের সেবা একসঙ্গে চালু হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট কোম্পানির ঝুঁকি, গ্রাহক সুরক্ষা, অর্থপাচার প্রতিরোধ, লেনদেন নিষ্পত্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও ব্যাংকগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে।
পেপ্যাল চালু হলে কী বদলাবে?
বাংলাদেশে পেপ্যাল বা সমমানের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন সেবাদাতারা। বর্তমানে অনেকেই পেওনিয়ার, ওয়াইজ বা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেন। পেপ্যাল চালু হলে আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ ও দেশে আনার ক্ষেত্রে আরও একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হবে।
বিশ্বজুড়ে পেপ্যালের ব্যাপক ব্যবহার এবং ক্রেতা সুরক্ষা সুবিধা থাকায় বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যেও এর চাহিদা রয়েছে। ফলে নতুন ডলার ওয়ালেট কাঠামো বাস্তবে কার্যকর হলে পেপ্যালের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবাদাতার বাজারে প্রবেশের পথও সহজ হতে পারে।
তবে বাংলাদেশে পেপ্যাল কবে আনুষ্ঠানিকভাবে সেবা চালু করবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ঘোষণা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যোগাযোগ ও নীতিগত প্রস্তুতি এগোলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক অনুমোদন, অংশীদারত্ব কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের ওপর।
সুতরাং নতুন নীতিমালা বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও, এটিকে এখনই পেপ্যালের বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক যাত্রার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘদিনের আলোচনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে এটিকে দেখা যায়।