প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাপানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধের মধ্যেই বিরোধপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে রাশিয়ার নৌবাহিনী। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাপান। গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ওই বিরোধপূর্ণ দ্বীপগুলোর একটি সফর করার পর নতুন করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ওমানে সফররত জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি বলেন, ফোর নর্দার্ন আইল্যান্ডসে রাশিয়ার সামরিক শক্তি বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ জাপান মেনে নেবে না। তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ওই ভূখণ্ড নিয়ে জাপানের অবস্থানের পরিপন্থী।
রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহর বৃহস্পতিবার জানায়, বিরোধপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ ইতুরুপে ভূমি থেকে জাহাজে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়েছে। জাপানে দ্বীপটি এতোরোফু নামে পরিচিত। মহড়ায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে থাকা সব নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে রুশ নৌবাহিনী।
রুশ সামরিক বাহিনীর এই মহড়ায় একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন এবং একটি গাইডেড-মিসাইল ক্রুজারও অংশ নেয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিনের ভূখণ্ড বিরোধ
ইতুরুপসহ চারটি দ্বীপ নিয়ে জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। জাপান এসব দ্বীপকে ‘নর্দার্ন টেরিটরিজ’ বা ‘ফোর নর্দার্ন আইল্যান্ডস’ নামে অভিহিত করে। অন্যদিকে রাশিয়া এগুলোকে কুরিল দ্বীপপুঞ্জের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বীপগুলো জাপানের কাছ থেকে দখল করে নেয়। এরপর থেকে দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। এই বিরোধের কারণে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিচুক্তির বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে জটিল হয়ে আছে।
সম্প্রতি রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা এবং পুতিনের ওই অঞ্চল সফরের কারণে বিরোধটি আবারও আলোচনায় এসেছে।
বড় আকারের সামরিক মহড়া
রুশ নৌবহরের সামরিক মহড়া ৪ আগস্ট শুরু হয়। জাপানকে আগেই জানানো হয়েছিল যে মহড়ায় সরাসরি গোলাবর্ষণের অনুশীলনও থাকবে। এর পরদিন, ৫ আগস্ট জাপান বড় আকারের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়।
রুশ বার্তা সংস্থা তাসের তথ্য অনুযায়ী, মহড়ায় রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের প্রায় ৬০টি যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন ও সহায়ক জাহাজ অংশ নেয়। এ ছাড়া প্রায় ৩০টি বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন এবং ১৩ হাজারের বেশি সেনাসদস্য মহড়ায় যুক্ত ছিলেন।
এই বিশাল সামরিক উপস্থিতি জাপানের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডের কাছাকাছি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অনুশীলনকে টোকিও রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখছে।
পুতিনের সফরের পর উত্তেজনা
গত সপ্তাহে চারটি বিরোধপূর্ণ দ্বীপের অন্যতম ইতুরুপ সফর করেন ভ্লাদিমির পুতিন। একই সফরে তিনি জাপানের উত্তরে অবস্থিত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন সাখালিন দ্বীপও পরিদর্শন করেন।
১২ আগস্ট সাখালিন সফরের সময় পুতিন রুশ নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ ‘ভারিয়াগ’ থেকে সামরিক মহড়ার কিছু অংশ পর্যবেক্ষণ করেন বলে জানা গেছে।
পুতিনের এই সফরের পর টোকিও ও মস্কোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক তলবের পরিস্থিতি তৈরি হয়। জাপান দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপগুলোর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে রাশিয়া সেখানে নিজেদের প্রশাসনিক ও সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
মহড়া চলবে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত
রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের এই সামরিক মহড়া ২৯ আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা ছিল। মহড়ায় নৌবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বিত কার্যক্রম, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং অন্যান্য সামরিক অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডের কাছে এ ধরনের সামরিক তৎপরতা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে জাপানের সম্পর্কের অবনতি এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ।
জাপান একদিকে নিজেদের ভূখণ্ডগত দাবির অবস্থান বজায় রাখছে, অন্যদিকে রাশিয়া ওই দ্বীপগুলোতে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে। ফলে দীর্ঘদিনের এই ভূখণ্ড বিরোধের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনাও নতুন মাত্রা পাচ্ছে।