আন্তরিকতা থাকলে ঢাকাকে বাসযোগ্য করা সম্ভব: সেলিম উদ্দিন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
আন্তরিকতা থাকলে ঢাকাকে বাসযোগ্য করা সম্ভব: সেলিম উদ্দিন

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিলে রাজধানী ঢাকাকে আরও পরিচ্ছন্ন, দখলমুক্ত ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। তাঁর মতে, রাজধানীর নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধানে শুধু নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, বরং জনগণের অভিযোগ গ্রহণ, তা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের স্বচ্ছ হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।

মঙ্গলবার রাজধানীর বারিধারায় জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ক্লিন ঢাকা’ কর্মসূচির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরার সময় এসব কথা বলেন সেলিম উদ্দিন। এ সময় তিনি রাজধানীর খাল, ড্রেন, ফুটপাত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশা নিধন এবং নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে দলের পক্ষ থেকে বেশ কিছু দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেন।

সেলিম উদ্দিন বলেন, নগরবাসীর অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর ও সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। মানুষ যাতে নির্ভয়ে নিজের এলাকার সমস্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতি মাসে কতটি অভিযোগ পাওয়া গেল এবং এর মধ্যে কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে, সেই তথ্যও প্রকাশ করতে হবে। তাঁর ভাষায়, নাগরিকদের সামনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে নগর ব্যবস্থাপনায় আস্থা বাড়বে।

তিনি বলেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনগুলো যদি এ ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বিরোধী দলও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। রাজধানীকে বাসযোগ্য করার বিষয়টি কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; বরং এটি নগরবাসীর সম্মিলিত স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সেলিম উদ্দিন জানান, গত ২৫ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মহানগর উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় সপ্তাহব্যাপী ‘ক্লিন ঢাকা’ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। কর্মসূচির আওতায় খাল ও ড্রেন পরিষ্কার, বর্জ্য অপসারণ এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, এই কর্মসূচিতে ঢাকা মহানগর উত্তরের ৫৪টি ওয়ার্ডে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

তিনি জানান, সাত দিনের ওই কর্মসূচিতে মোট ২৯০টি খাল ও ড্রেন পরিষ্কার করা হয়েছে এবং ২০৪ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। দলীয়ভাবে পরিচালিত এ কার্যক্রমে তাঁর সঙ্গে ২৫ হাজার ৮২৮ জন স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন বলে তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে সাধারণ মানুষও এসব কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও জলপ্রবাহের সঙ্গে খাল-নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে সেলিম উদ্দিন বলেন, নগরের খাল ও জলাধারগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করা না গেলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসা কঠিন। এ কারণে কোন খাল কখন দখলমুক্ত করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী, তা সিটি করপোরেশনকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।

খালের দখল পরিস্থিতি নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশেরও দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, কোথায় কী পরিমাণ দখল রয়েছে এবং এসব দখলের সঙ্গে কারা জড়িত, সে তথ্য জনগণের সামনে আসা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা শতভাগ পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

ঢাকার ফুটপাত দখল করে পরিচালিত ব্যবসার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে গুরুত্ব পায়। সেলিম উদ্দিন বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হলে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে জীবিকা নির্বাহ করা হকারদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাদের উচ্ছেদ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন চাইলে হকারদের জন্য একাধিক হলিডে মার্কেট চালু করতে পারে বলে তিনি প্রস্তাব দেন।

রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন সেলিম উদ্দিন। তাঁর দাবি, শুধু নির্দিষ্ট মৌসুমে মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। সারা বছর ধরে নিয়মিত ও পরিকল্পিত কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি মাসে মশা নিধন কার্যক্রমে কী ধরনের কাজ হয়েছে, কোথায় কতটুকু কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং এর ফলাফল কী, সেই হিসাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক সেবার তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, একটি ওয়ার্ডে কী ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, কতটা বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে কিংবা কোন এলাকায় কী ধরনের নাগরিক সমস্যা রয়েছে, এসব তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়বে। এতে নাগরিকরাও নিজেদের এলাকার সমস্যা সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারবেন।

রাজধানীর পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর অংশ হিসেবে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে বর্জ্য থেকে তৈরি কলম শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপহার দেওয়ার কথাও জানান সেলিম উদ্দিন। বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদে পরিণত করার মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন সেলিম উদ্দিন। নির্বাচন যেন দখলদারি, প্রভাব বিস্তার ও কারচুপিমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত ও প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।

এক প্রশ্নের জবাবে সেলিম উদ্দিন তাঁর ‘ক্লিন ঢাকা’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে দাবি করেন, এর মাধ্যমে রাজধানীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দখলমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি এ পরিস্থিতির পেছনে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্ব ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। তবে নগরীর দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ, সমন্বয় এবং নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা ও নাগরিক চাপ ক্রমাগত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, মশার উপদ্রব এবং খাল-জলাধার রক্ষার মতো বিষয়গুলো নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, সিটি করপোরেশন, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সেলিম উদ্দিনের বক্তব্যেও নাগরিক সম্পৃক্ততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান ও ইয়াসিন আরাফাত এবং প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকারসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সেলিম উদ্দিনের বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো, রাজধানীর নাগরিক সমস্যাকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে নিয়ে গিয়ে বাস্তবভিত্তিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া। অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তা নিষ্পত্তির হিসাব প্রকাশ, খাল-ড্রেন পরিষ্কার, ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্য উন্মুক্ত করার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে নগরবাসীর দৈনন্দিন ভোগান্তি কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এখন এসব দাবি ও প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটিই হয়ে উঠতে পারে ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত