প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দ্বিতীয় মেয়াদে জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন হাকাইন্দে হিচিলেমা। বিতর্কিত নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পাওয়ার পর মঙ্গলবার রাজধানী লুসাকার ন্যাশনাল হিরোস স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন তিনি। নতুন মেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত করা, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এই নেতা।
তবে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের সময় জাম্বিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রধান বিরোধী প্রার্থী ব্রায়ান মুন্দুবিলে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটের ফল পরিবর্তন করা হয়েছে এবং নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করার যথাযথ সুযোগও তিনি পাননি। নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনার অভিযোগ ঘিরেও দেশটির রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
গত ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সরকারি ফল অনুযায়ী হিচিলেমা প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মুন্দুবিলে পেয়েছেন ৩৮ শতাংশ ভোট। ফল ঘোষণার পর মুন্দুবিলে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি, ভোটের ফল পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ফলের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে আদালত বন্ধ থাকায় বিরোধী পক্ষ কার্যকরভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে পারেনি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণেও ভোট গণনার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন, অনেক ভোট গণনাকেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণার পর তাৎক্ষণিকভাবে গণনার কাগজে তা নথিভুক্ত করা হয়নি। পাশাপাশি ডিজিটাল তথ্যের সঙ্গে কাগজে সংরক্ষিত নথির মিল যাচাইয়ের ব্যবস্থাও যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না বলে তারা উল্লেখ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনার অপেক্ষায় কার্যক্রম বন্ধ রেখেছিলেন বলেও পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যদিও ভোটের দিন সার্বিক পরিস্থিতি বেশির ভাগ সময় শান্ত ছিল বলে নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন, ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। নির্বাচনের পরদিন রাজধানী লুসাকার একটি সম্পত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালায়। ওই সম্পত্তির সঙ্গে মুন্দুবিলের সম্পর্ক ছিল বলে জানানো হয়। অভিযানের সময় সাবেক এক মন্ত্রিসভা সদস্য নিহত হন। বিরোধী দলের কয়েকজন রাজনীতিককেও আটক করা হয়। কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনার অভিযোগ আনে। তবে বিরোধী নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পরবর্তী সময়ে মুন্দুবিলে ও তাঁর নির্বাচনী সহযোগী মেকেবি জুলু আত্মগোপনে চলে যান। গত সপ্তাহে পুলিশ তাঁদের আটক করে। সপ্তাহান্তে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। মুন্দুবিলের গ্রেপ্তার ও নির্বাচনী ফল নিয়ে বিরোধীদের আপত্তির মধ্যেই হিচিলেমার শপথ গ্রহণ রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
শপথ অনুষ্ঠানে অবশ্য নিজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর গ্রেপ্তার নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি হিচিলেমা। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য সহিংসতার পথ বেছে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। হিচিলেমা বলেন, জাম্বিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিনিময়ে কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বিরোধীদের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান। তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি নয়। মতের পার্থক্য থাকলেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ থাকতে হবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাঁর সরকারের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিরোধীদের কোনো ভালো প্রস্তাব থাকলে সরকার তা শুনবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।
লুসাকার ন্যাশনাল হিরোস স্টেডিয়ামে আয়োজিত শপথ অনুষ্ঠানে হাজারো সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। উৎসবমুখর পরিবেশে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য শপথ নেন হিচিলেমা। একই অনুষ্ঠানে তাঁর নির্বাচনী সহযোগী মুতালে নালুমাঙ্গো ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেনিয়া, বতসোয়ানা, জিম্বাবুয়ে, নামিবিয়া ও তানজানিয়ার প্রেসিডেন্টরা ছিলেন।
হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো। ২০২১ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার সময় জাম্বিয়া গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিল। তামা উৎপাদননির্ভর দেশটি আন্তর্জাতিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছিল এবং একই সময়ে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ২৪ শতাংশেরও বেশি ছিল। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল এবং দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ ছিল।
সাবেক ব্যবসায়ী হিচিলেমা ক্ষমতায় আসার পর দেশের ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। বিদেশি ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব প্রচেষ্টার ফলে মূল্যস্ফীতি কমেছে এবং অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে বলে তাঁর সরকার দাবি করে। তবে অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
নির্বাচনের আগে রাজধানী লুসাকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিচিলেমা তাঁর সরকারের উত্তরাধিকার হিসেবে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতায় আসার সময় অর্থনীতি নিম্নমুখী ছিল। প্রথম মেয়াদে কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এখন সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আরও প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির দিকে দেশকে এগিয়ে নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
শপথ গ্রহণের ভাষণেও তিনি অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেন। হিচিলেমা বলেন, জাম্বিয়া এখন স্থিতিশীলতা থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁর সরকারের প্রথম মেয়াদে কঠিন কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছর দেশের সব মানুষের প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করার সময়।
জাম্বিয়ার অর্থনীতিতে তামা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য ও রাজস্ব আয়ের বড় একটি অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে তামার দামের ওঠানামার সঙ্গে দেশটির অর্থনীতির অবস্থাও অনেকাংশে পরিবর্তিত হয়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে তামার দাম বাড়ায় জাম্বিয়ার অর্থনীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের ফল নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের গ্রেপ্তার এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন দেশটির গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ফলে অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি বিরোধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ, আইনের শাসন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনও তাঁর সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে হিচিলেমা কতটা সফলভাবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন, সেটিই এখন জাম্বিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একদিকে তামার বাজারে সম্ভাবনা ও ঋণ পুনর্গঠনের অগ্রগতি দেশটির অর্থনীতিতে আশার জায়গা তৈরি করেছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রাজনৈতিক বিভাজন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানে জাতীয় ঐক্য, শান্তি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে বার্তা দিয়েছেন হিচিলেমা, আগামী পাঁচ বছরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মূল্যায়নের জায়গা হয়ে উঠবে।