ইরানি হামলায় মার্কিন সেনা নিহতের দাবি আইআরজিসির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
ইরানি হামলায় মার্কিন সেনা নিহতের দাবি আইআরজিসির

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। হামলায় বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত এবং কয়েকটি সামরিক স্থাপনা ও হামলাকারী হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের এই এলিট বাহিনী। তবে মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। বরং জর্ডানের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১০টি প্রতিহত করা হয়েছে এবং বাকি তিনটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। হামলায় কোনো হতাহত বা প্রাণহানির খবরও জানায়নি জর্ডান।

আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, জর্ডানের আকাবা উপসাগরের কাছে অবস্থিত মার্কিন মেরিনদের ঘাঁটি ক্যাম্প টিটিনকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। ইরানের ভাষ্য, দক্ষিণ ইরানের সিরিক এলাকায় একটি আবাসিক বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলার জবাবে তাদের পাল্টা অভিযান শুরু হয়েছে। ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ বেশ কয়েকজন হতাহত হওয়ার পর ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে ক্যাম্প টিটিনকে আকাবা উপসাগরের কাছে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষণ ও মেরিন স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইআরজিসি বলেছে, তাদের মহাকাশ বাহিনী ক্যাম্প টিটিনে ব্যাপক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। হামলায় মার্কিন সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং সামরিক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।

তবে ইরানের এই দাবির সঙ্গে জর্ডানের সরকারি বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১০টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ভূপাতিত করা হয়। বাকি তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। প্রাথমিকভাবে হামলায় কোনো হতাহত বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ।

মার্কিন কর্মকর্তারাও এখন পর্যন্ত জর্ডানে ইরানের হামলায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেননি। ফলে আইআরজিসির পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, সেটি এই মুহূর্তে অপ্রমাণিত। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের দেওয়া সামরিক তথ্যের স্বাধীন যাচাই কঠিন হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে।

এই পাল্টাপাল্টি হামলার সূত্রপাত হয়েছে দক্ষিণ ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের পর। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানের সাম্প্রতিক তৎপরতা এবং মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে এসব অভিযান চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের অভিযানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং অন্যান্য সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করা হয়েছে।

এর পরই ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়। আইআরজিসি জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তাদের প্রতিশোধমূলক অভিযান শুরু হয়েছে এবং এই অভিযান শুধু একটি স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। জর্ডানের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও স্বার্থকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর খবরও পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, সিরিক এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাটি ইরানের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির কাছের কুহেস্তাক এলাকায় একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় মার্কিন হামলা হয়। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট ও অন্যান্য সরকারি সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ওই ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও ছিল বলে জানানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ঘটনাটি ইরানের জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তেহরান এটিকে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা হিসেবে দেখছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের সামরিক অভিযান ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও হুমকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়েছে। বেসামরিক হতাহতের অভিযোগের বিষয়ে ওয়াশিংটন সরাসরি কোনো দায় স্বীকার করেনি।

নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরুর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। জর্ডান, ইরাক, বাহরাইন, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও স্বার্থের বিরুদ্ধে ইরানের হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাও অব্যাহত রয়েছে। ফলে সংঘাতটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি লড়াইয়ের বাইরে পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল হিসাব বা অতিরিক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়া। একটি হামলায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য প্রকাশ পেলে পাল্টা হামলার মাত্রা আরও বাড়তে পারে। এর ফলে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানের দাবি অনুযায়ী, ক্যাম্প টিটিনে হামলায় বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত এবং সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু জর্ডান ও মার্কিন সূত্রে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি। তাই আইআরজিসির দাবিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্যের স্বাধীন যাচাই না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এর মধ্যেই ইরান জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তাদের সামরিক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক এই সংঘাত কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত উত্তেজনা কমানো না গেলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত