প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মালয়েশিয়ায় তীব্র গরম, তাপজনিত অসুস্থতা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এর প্রভাব বিশেষভাবে পড়ছে শিশু ও তরুণদের ওপর। চলতি বছর দেশটির আবহাওয়া বিভাগ একাধিকবার তীব্র গরমের সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে বন্যা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে শিক্ষা, তথ্য ও নিরাপদ আশ্রয়সহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাঘাত ঘটছে।
ইউনিসেফ মালয়েশিয়ার ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভে ২০২৫’-এর ফলাফল পরিস্থিতিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত ওই জরিপে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনীতির জন্যও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে।
২০২৫ সালের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১ হাজার ৪২০ জন তরুণের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এতে অংশ নেওয়া তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
জরিপ অনুযায়ী, ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ বলেছেন, আগে থেকেই থাকা বিভিন্ন রোগের অবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও খারাপ হয়েছে। প্রায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ ত্বকের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন তাপজনিত অসুস্থতার কথা। আর ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার কথা বলেছেন।
জরিপের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জলবায়ু দুর্যোগের প্রভাব। অর্ধেকেরও বেশি তরুণ জানিয়েছেন, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ তাঁদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সুযোগকে প্রভাবিত করেছে। এসব সেবার মধ্যে তথ্য, শিক্ষা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মতো মৌলিক বিষয়ও রয়েছে।
সানওয়ে সেন্টার ফর প্ল্যানেটারি হেলথের নির্বাহী পরিচালক ডা. জেমিলাহ মাহমুদের মতে, জরিপের ফলাফল দেখাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি পড়ছে। তাঁর ভাষায়, সরাসরি দুর্যোগের আঘাত, সংক্রামক রোগ, দীর্ঘমেয়াদি রোগের অবনতি এবং মানসিক চাপ—সবকিছু একই সময়ে তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
মালয়েশিয়াভিত্তিক সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল স্টাডিজের জলবায়ুবিষয়ক উপদেষ্টা রেনার্ড সিউ বলেছেন, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, দেশটিকে একই সঙ্গে উভয় দিকেই কাজ করতে হবে।
সিউ বলেন, শিশু ও তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম। কিন্তু অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন খাতে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তাঁর মতে, এখন অভিযোজনের পেছনে বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যয় আরও বেশি হবে।
ঘন ঘন তাপজনিত চাপ, রোগের বিস্তার এবং জলবায়ুজনিত বিভিন্ন ব্যাঘাত মানুষের উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়তে পারে এবং সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব বিষয় মালয়েশিয়ার কর্মশক্তির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতাকে দুর্বল করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রচণ্ড গরমের ক্ষেত্রে শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের শরীর প্রাপ্তবয়স্কদের মতো কার্যকরভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে প্রচণ্ড গরমে তারা দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে।
কুয়ালালামপুরভিত্তিক চিকিৎসক ডা. ভেনু গোপালানের মতে, তীব্র গরমে শিশুদের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দ্রুত চাপের মুখে পড়ে। এর ফলে পানিশূন্যতা এবং শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাপজনিত অসুস্থতার তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে পেশিতে টান, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিট এক্সহস্টশন এবং হিটস্ট্রোক। গুরুতর হিটস্ট্রোক প্রাণঘাতীও হতে পারে। দীর্ঘ সময় বা বারবার প্রচণ্ড গরমের মধ্যে থাকলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের রোগ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার কারণে অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
চলতি বছর মালয়েশিয়ায় তীব্র গরমের পরিস্থিতি একাধিকবার দেখা গেছে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত দেশটির উত্তরাঞ্চল এবং সাবাহর কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল।
আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার কেলান্তানের কুয়ালা ক্রাইয়ে দেশের সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এরপর ছিল পাহাংয়ের তেমেরলোহ, যেখানে তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে তাপজনিত অসুস্থতার ঘটনাও সামনে এসেছে। মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে তাপজনিত অসুস্থতার ৭৩টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯টি ছিল তাপজনিত অবসাদ, ছয়টি পরিশ্রমজনিত হিটস্ট্রোক, চারটি হিটস্ট্রোক, প্রসবের পর অতিরিক্ত জ্বরের দুটি ঘটনা এবং হিট ক্র্যাম্পের দুটি ঘটনা।
ওই সময়ে তাপজনিত কারণে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং দুজন শিশু। শিশু দুটির বয়স ছিল দুই ও চার বছর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু আবহাওয়া সতর্কতা জারি করলেই হবে না। খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিক, গৃহহীন মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের মতো দীর্ঘ সময় গরমের মধ্যে থাকতে বাধ্য হওয়া মানুষের জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ডা. গোপালানের মতে, তাপজনিত অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা জরুরি, যাতে দ্রুত চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। শুধু বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ অনেক মানুষের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়। তাই কর্মক্ষেত্র, স্কুল ও জনসমাগমস্থলে তাপ মোকাবিলার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও ৩১ জুলাই সতর্ক করে জানিয়েছিল, এল নিনোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে এবং আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে অনেক এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
মালয়েশিয়ার জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থায় কিছু অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ডা. জেমিলাহ মাহমুদের মতে, দেশটি জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং জলবায়ু আইন এগিয়ে নেওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমের সমন্বয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
রেনার্ড সিউয়ের মতে, মালয়েশিয়ার জলবায়ু মোকাবিলার বড় পরিকল্পনা থাকলেও স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ খাত এখনো অনেক ক্ষেত্রে আলাদাভাবে কাজ করছে। স্কুলগুলোতে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন, তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনা, বায়ুর মান নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
তাঁর মতে, জলবায়ু অভিযোজনের দায়িত্ব শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রম, নগর পরিকল্পনা এবং স্থানীয় প্রশাসন—সব খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ফলে আজ জলবায়ু সহনশীলতায় বিনিয়োগকে শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার ওপর বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে সুরক্ষিত রাখা গেলে দীর্ঘমেয়াদে মালয়েশিয়ার কর্মশক্তি ও অর্থনীতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সামলাতে আরও সক্ষম করে তোলা সম্ভব হবে।
SEO: বাংলা
Suggest Focus Key phrase:
SEO Title:
Meta Description: