প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করতে ইতোমধ্যে চার সদস্যের একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে।
বুধবার দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধান দলের নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালাম। অভিযোগের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করবে দলটি।
দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় আসিফ মাহমুদ ছাড়া আরও যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা হলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োগ, বদলি ও সরকারি কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দুদকের নজরে এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কোনো ধরনের প্রভাব খাটানো, নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম কিংবা সরকারি অর্থ ব্যবহারে অসঙ্গতি ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
সরকারি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নিয়োগ, বদলি এবং কেনাকাটার মতো কার্যক্রম সাধারণত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সরকারি বিধিবিধানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এসব ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নথি, অনুমোদন প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধাপ এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুদকের অনুসন্ধানেও অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বেও ছিলেন। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পর দায়িত্ব পালনকালের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হয়েছে। এবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করল দুদক।
তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য হলো অভিযোগের পেছনে বাস্তব কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি ঘটেছে কি না, ঘটলে তার সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন এবং সরকারি অর্থ বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা যাচাই করা। অনুসন্ধান শেষে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে।
দুদকের এই পদক্ষেপের ফলে এখন আলোচনার কেন্দ্রে আসবে মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়া এবং সরকারি কেনাকাটার বিভিন্ন নথি। কোনো সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদনের ভূমিকা কী ছিল, ক্রয়প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় ছিল কি না—এসব বিষয় অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ সাধারণ মানুষের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ সরকারি অর্থ মূলত জনগণের অর্থ, যা কর, রাজস্ব ও রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব। একইভাবে সরকারি নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিয়ে জনসাধারণের প্রত্যাশা ছিল বেশি। সেই সময় দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই তাই রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দুদকের অনুসন্ধান সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে অনুসন্ধান দলের নেতৃত্বে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালাম থাকায় অভিযোগগুলো নথিভিত্তিকভাবে যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। অনুসন্ধান চলাকালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা করা হতে পারে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন ও দুদকের বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে অনুসন্ধানে অভিযোগের পর্যাপ্ত ভিত্তি না পাওয়া গেলে সেটিও প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই পুরো বিষয়টি এখনো অনুসন্ধানাধীন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও প্রমাণ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুদকের এই অনুসন্ধান রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অনুসন্ধানের ফলাফল ভবিষ্যতে সরকারি দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর পক্ষে কী ধরনের তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট চার ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে কী সিদ্ধান্তে পৌঁছায় দুদক। অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে রাষ্ট্রীয় অর্থ, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা যে গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে গুরুত্ব রয়েছে।