সর্বশেষ :
নাটোরে দিনভর অভিযানে মাদকসহ চারজন গ্রেপ্তার কৃষি মন্ত্রণালয় কমিটির সভাপতি হলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ‘বিরোধী দল দমনের চক্রান্ত’: এনসিপি টিকিট কালোবাজারির প্রতিবাদে যাত্রীকে মারধরের অভিযোগ দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহার না হলে আইনি ব্যবস্থা: আসিফ মাহমুদ বর্ষার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ লাকসাম পৌরসভায় নির্বাচনি হাওয়া, সরগরম সম্ভাব্য প্রার্থীরা আসিফের দুর্নীতি এনসিপিতে ‘ওপেন সিক্রেট’: রাশেদ খান বেনজীরের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ নড়াইলে শিক্ষার্থীর মৃত্যু, মারধরের অভিযোগে তিন শিক্ষক আটক

সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় ১৬ হাজার কোটি, প্রশ্নের মুখে অনুমোদন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় ১৬ হাজার কোটি, প্রশ্নের মুখে অনুমোদন

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের ব্যয় কয়েক দফায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকায় পৌঁছানো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে প্রায় ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটির ব্যয় প্রথম সংশোধনে বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। পরে দ্বিতীয় দফার সংশোধনে ব্যয় আরও বাড়িয়ে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা করা হয়।

ফলে মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে এই কারণে যে, প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতি তখনো ১০ শতাংশের নিচে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজের এত কম অগ্রগতির মধ্যেই কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে এখন আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে।

ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় বড় পানি শোধনাগার প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। রাজধানীর পানি সংকট মোকাবিলা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জনস্বার্থে নেওয়া একটি বড় প্রকল্পের ব্যয় এত দ্রুত এবং এত বেশি বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই এর পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ এবং সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা করা হয়। অর্থাৎ প্রথম সংশোধনেই ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এরপর দ্বিতীয় দফার সংশোধনে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা।

হিসাব অনুযায়ী, মূল প্রকল্প ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ১১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা যুক্ত হয়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময় বৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি বা নতুন কাজ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে ব্যয় বাড়তে পারে। তবে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি খুব কম থাকা অবস্থায় এত বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ কী ছিল, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, একটি প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের ক্ষেত্রে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও বাস্তবিক কারণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ প্রকল্পের প্রতিটি অতিরিক্ত টাকা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থ এবং জনগণের করের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে একই ধরনের গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করার কারণে। গন্ধর্বপুর প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা হলেও এর পানি শোধন সক্ষমতা বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই প্রকল্পে পাইপলাইনের পরিধিও তুলনামূলকভাবে বড়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বেশি সক্ষমতা ও বড় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও গন্ধর্বপুর প্রকল্পের ব্যয় সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত ব্যয়ের চেয়ে কম কেন। দুই প্রকল্পের প্রযুক্তি, নকশা, নির্মাণব্যয় এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তবে সেই পার্থক্যগুলো বিশ্লেষণ করলেই সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই ব্যয় বৃদ্ধির সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তাকে কেন্দ্র করে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়া বা কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি না—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। তাই অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির পুরো প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদক। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং একটি দল গঠন করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানের সঙ্গে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগগুলোর সঙ্গে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি বা অনুমোদন প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই হতে পারে বলে জানা গেছে।

দুদকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ কমিশনের কাছে এসেছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং অনুসন্ধান শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই কোনো ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন—এমন নয়। তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। এ কারণে সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ওঠা প্রশ্নেও নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রকল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়লে শুধু অতিরিক্ত অর্থের বিষয়টি বিবেচনা করলেই যথেষ্ট নয়। কেন ব্যয় বাড়ল, প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণে কোনো ভুল ছিল কি না, প্রকল্পের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে কি না এবং সংশোধিত ব্যয়ের প্রতিটি অংশ কতটা প্রয়োজনীয় ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার।

বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি নিয়ে অতীতেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সময় পরিকল্পনার দুর্বলতা, বাস্তবায়নে বিলম্ব, দরপত্র প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে। আবার কোথাও কোথাও অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগও উঠে আসে। তাই প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে আলাদা করে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন প্রয়োজন।

সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এখন মূল প্রশ্ন হলো, ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার প্রকল্পটি কী কারণে কয়েক দফা সংশোধনের পর ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকায় পৌঁছাল। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ১০ শতাংশের নিচে থাকা অবস্থায় এত বড় ব্যয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা কী ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

এ ছাড়া প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ ও সংশোধনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, তা পর্যালোচনা করলে পুরো বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে। জনগণের অর্থে পরিচালিত এমন একটি বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সব সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

দুদকের সম্ভাব্য অনুসন্ধান বা চলমান অভিযোগ যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও আইনি ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

এখন সবার দৃষ্টি থাকবে অনুসন্ধানের ফলাফলের দিকে। কারণ সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পের আর্থিক হিসাব নয়; এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি বড় পরীক্ষাও হয়ে উঠেছে।

প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বাস্তব ও যৌক্তিক কারণ থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। আর যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠবে। একটি বড় প্রকল্পে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কারণে পুরো বিষয়টির স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত