সর্বশেষ :

কয়েক মাসেই সোলার বিদ্যুতের আওতায় আসছে জাতীয় সংসদ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
কয়েক মাসেই সোলার বিদ্যুতের আওতায় আসছে জাতীয় সংসদ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনার বিদ্যুতের চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পূরণের এই উদ্যোগকে সরকারের বৃহত্তর জ্বালানি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু বড় সরকারি স্থাপনাই নয়, সাধারণ মানুষকেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে রুফটপ সোলার বা ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে চায় সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই জাতীয় সংসদ সোলার সিস্টেমের আওতায় আসবে। সংসদ ভবনের বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ বা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সৌরশক্তি থেকে পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরেই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। গ্যাস, তেল ও কয়লার মতো প্রচলিত জ্বালানির পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎকে ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ভবনের ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকায় রুফটপ সোলার ব্যবস্থাকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ানোর জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার এবং ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয় কমিয়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা গেলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

রুফটপ সোলার ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করতে সরকার বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রেও বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, সরকার তাদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ একটি রুফটপ সোলার স্থাপনা শুধু নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা পূরণেই সহায়তা করবে না, অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও তৈরি করবে।

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রুফটপ সোলার থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ৬ থেকে ৭ টাকা ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত দামে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সায় বিদ্যুৎ কিনলে উদ্যোক্তাদের জন্য লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ পেতে পারেন। তবে প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে সোলার স্থাপনের ব্যয়, উৎপাদন সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতির ওপর।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করে সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করবেন, তাদের জন্য নির্ধারিত ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরের সুবিধা তিন বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপিত সোলার ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পরবর্তী তিন বছর সরকার ওই নির্ধারিত দামে কিনবে।

এই ঘোষণা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় রুফটপ সোলার স্থাপনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইনও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি সংস্থার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশের সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়েও রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বাইরে সরকারি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি ভবনের বিপুল সংখ্যক ছাদ রয়েছে, যেগুলো পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। বিশেষ করে দিনের বেলায় অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে। একই সময়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ফলে রুফটপ সোলার ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।

তবে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রাথমিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বড় পরিসরে রুফটপ সোলার কর্মসূচি সফল করতে হলে এসব বিষয়েও কার্যকর পরিকল্পনা থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য আগামী ১০ বছরের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কিছুদিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে বলে তিনি জানান।

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জাতীয় সংসদকে সোলার সিস্টেমের আওতায় আনার পরিকল্পনা তাই শুধু একটি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নয়; এটি সরকারি পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর একটি প্রতীকী এবং বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারি ভবন থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং দেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক স্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত প্রণোদনা, কর সুবিধা এবং নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কেনার উদ্যোগ কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং সাধারণ মানুষ ও উদ্যোক্তারা কতটা আগ্রহ নিয়ে রুফটপ সোলার ব্যবস্থায় যুক্ত হন। কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সৌরশক্তি আগামী বছরগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত