প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল, আটা ও বিস্কুট উৎপাদনে ব্যবহৃত ভিটামিন ও মিনারেল আমদানিতে কর, ভ্যাট ও অন্যান্য শুল্ক মওকুফের আবেদনকে কেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে বিশেষ কর সুবিধা বা রেয়াত চেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে। বিষয়টি সামনে আসার পর সরকারি দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তির পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ সুবিধা চাওয়ার ঘটনায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং নৈতিকতার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, তারা যে সুবিধা চেয়েছে, তার উদ্দেশ্য শুধু ব্যবসায়িক লাভ নয়; দেশে প্রয়োজনীয় শিল্প গড়ে তোলা, আমদানি ব্যয় কমানো এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনের খরচ কমানোও তাদের পরিকল্পনার অংশ। অন্যদিকে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সরকারি পদ ও পারিবারিক ব্যবসার মধ্যে কোনো ধরনের প্রভাব বা সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তা জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলসের পক্ষ থেকে কর মওকুফ বা বিশেষ রেয়াতের আবেদন করা হয়েছে। আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ভিজিটিং কার্ড সংযুক্ত করার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ কর সুবিধা চাইলে সেই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, নীতিমালা এবং সমতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা পরিচালনার সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী সরকারি ব্যক্তির পারিবারিক সম্পর্ক থাকলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলসের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বগুড়ার শিবগঞ্জের বেতগাড়ী মীরবাড়ী এলাকায় অবস্থিত এবং ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ফোর্টিফাইড রাইস কার্নেল উৎপাদন করে। ফোর্টিফাইড বা পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল তৈরিতে সাধারণ চালের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে বিশেষ পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ কার্নেল মেশানো হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৩ সাল থেকে তারা খাদ্য অধিদপ্তরে রাইস কার্নেল সরবরাহ করছে। সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও ভিজিডি কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্নেল সরবরাহ করার পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল সরবরাহ করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ফোর্টিফাইড রাইস কার্নেল উৎপাদনের জন্য ভিটামিন ও মিনারেল প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি১, ভিটামিন-বি১২, ফলিক এসিড, আয়রন, জিঙ্ক, ম্যাগনেশিয়াম এবং ক্যালসিয়াম কার্বোনেটসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহৃত হয়। এসব উপাদান পুষ্টিসমৃদ্ধ আটা ও বিস্কুট তৈরিতেও প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির আবেদনে বলা হয়েছে, এসব কাঁচামালের অনেকগুলো বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না। ফলে কার্নেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল বিদেশ থেকে প্রিমিক্স বা মিশ্রণ আকারে আমদানি করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, পৃথকভাবে প্রয়োজনীয় উপাদান আমদানি করে দেশে প্রিমিক্স উৎপাদন করা গেলে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস জানিয়েছে, তারা দেশে প্রিমিক্স উৎপাদনের জন্য একটি কারখানা স্থাপন করেছে। সেখানে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল কাঁচামাল হিসেবে আলাদাভাবে আমদানি করে প্রিমিক্স তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের দাবি, এ উদ্যোগ সফল হলে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে এবং অন্যান্য কার্নেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় প্রিমিক্স সংগ্রহ করতে পারবে।
প্রতিষ্ঠানটির যুক্তি হলো, কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট, কর ও অন্যান্য শুল্ক মওকুফ অথবা বিশেষ রেয়াত দেওয়া হলে দেশে নতুন শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই যুক্তির পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, সুবিধাটি যদি একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়া হয়, তাহলে অন্যান্য একই ধরনের প্রতিষ্ঠান কী ধরনের সুযোগ পাবে। করনীতির ক্ষেত্রে সমতা ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া বিশেষ সুবিধা বাজারে অন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ ঘটনায় নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য সরকারি পরিচয় ব্যবহার করা হলে তা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ব্যবসা ও সরকারি দায়িত্বের মধ্যে সুস্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এনবিআরের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সব ধরনের আবেদন আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করা উচিত।
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে কর বা শুল্ক ছাড় দেওয়ার সুযোগ সাধারণত সীমিত। কোনো নির্দিষ্ট খাতের জন্য নীতিগতভাবে ছাড় দেওয়া হলে একই ধরনের সব প্রতিষ্ঠান সেই সুবিধার আওতায় আসতে পারে।
তবে বিশেষ কোনো পণ্য যদি দেশে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে এবং জাতীয় স্বার্থে সেই শিল্পকে সীমিত সময়ের জন্য উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন হয়, তাহলে নীতিগতভাবে বিশেষ সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও আইন, নীতিমালা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
এনবিআরের সাবেক একজন সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ কর সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন থাকতে পারে। কোনো খাতের সব প্রতিষ্ঠানকে সমানভাবে সুবিধা দেওয়ার নীতিই সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য বলে তিনি মত দিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর শাকরুল আলম সীমান্তের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আবেদনটির পেছনে প্রতিমন্ত্রীর কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা বা প্রভাব ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই সেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের কর সুবিধার আবেদন এবং এর সঙ্গে সরকারি পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে কর, শুল্ক ও বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি সুশাসন ও জনআস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে পারিবারিক ব্যবসার কোনো সম্পর্ক দেখা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়—সবার জন্য কি একই নিয়ম কার্যকর হচ্ছে, নাকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে।
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়। এনবিআর যদি আবেদনটি আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে বিবেচনা করে, তাহলে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন হবে। আবেদনটি গ্রহণ করা হোক বা প্রত্যাখ্যান করা হোক, স্বচ্ছ সিদ্ধান্তই এ বিতর্কের সবচেয়ে কার্যকর উত্তর হতে পারে।
পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন এবং দেশে নতুন শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক নেই। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের জন্য তুলনামূলক কম দামে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু এসব জনস্বার্থের উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ন্যায্য প্রতিযোগিতা, সমান সুযোগ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সমান জরুরি।
প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের কর মওকুফের আবেদন তাই এখন শুধু একটি ব্যবসায়িক আবেদন হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরকারি দায়িত্ব, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যবসা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়ানোর প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন সবার দৃষ্টি থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্তের দিকে। এনবিআর আবেদনটি কীভাবে বিবেচনা করে এবং আইন ও নীতিমালার আলোকে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এই বিতর্কের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠবে।