প্রচলিত রাজনীতিতে হতাশ ব্রিটেনের তরুণ ভোটাররা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
প্রচলিত রাজনীতিতে হতাশ ব্রিটেনের তরুণ ভোটাররা

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রিটেনের রাজনীতিতে প্রচলিত দল ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশা ক্রমেই নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ ওয়েস্টমিনস্টারের পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামো, মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের প্রতি আস্থাহীন হয়ে উঠছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই হতাশার রাজনৈতিক সুবিধা কারা নিতে পারে, সেই প্রশ্নও এখন ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ এখনো ব্রিটিশ রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। রাজনৈতিক বিতর্ক, দলীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন এবং তাকে ঘিরে বিভিন্ন সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও জনমত জরিপে তার দল প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফারাজের উত্থানকে শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ব্রিটেনের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদেখাই থেকে যাবে।

দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী বিশ্লেষণে ব্রিটিশ ভোটারদের পরিবর্তিত রাজনৈতিক মনোভাবের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যারা রিফর্ম ইউকের উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন বা নাইজেল ফারাজের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করেন, তাদের সবাই একই ধরনের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নন। বরং এই ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের মানুষের একটি বড় সমাবেশ।

হোপ নট হেট নামের একটি সংগঠনের নতুন গবেষণার ভিত্তিতে পরিচালিত বিশ্লেষণে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মতামত বিবেচনা করা হয়েছে। ফোকালডাটার মাধ্যমে পরিচালিত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ফারাজবিরোধী ভোটারদের একটি বড় অংশ তুলনামূলকভাবে তরুণ, শহুরে, উচ্চশিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে প্রগতিশীল। কিন্তু এই চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে। ফারাজের বিরোধিতা করা বাকি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটারকে প্রচলিত অর্থে বামপন্থী বলা যায় না। তাদের অনেকেই সাংস্কৃতিক প্রশ্নে ডানঘেঁষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল অবস্থান পোষণ করেন।

এই বৈচিত্র্য ব্রিটিশ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করে। কারণ কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরোধিতা করলেই সব ভোটার একই বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে চলে যাবেন—এমন ধারণা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। একজন ভোটার ফারাজকে সমর্থন না করলেও তিনি লেবার পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস বা অন্য কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাশীল হবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।

গবেষণায় উঠে আসা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ। রিফর্ম ইউকের বিরোধিতা করা ডানঘেঁষা ভোটারদের একটি অংশ দলটির নীতিগত অবস্থানের চেয়ে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার সম্ভাবনাকে বেশি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ তাদের আপত্তি সবসময় ফারাজের রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষার বিরুদ্ধে নয়; বরং দলটির নেতৃত্ব, রাজনৈতিক আচরণ এবং সম্ভাব্য শাসনব্যবস্থাকে ঘিরে অনিশ্চয়তার সঙ্গেও যুক্ত।

এই বাস্তবতা দেখায় যে ব্রিটেনে রাজনৈতিক বিভাজন এখন শুধু বাম ও ডান—এই পরিচিত রেখায় সীমাবদ্ধ নেই। অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো প্রশ্নগুলো ভোটারদের সিদ্ধান্তকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। ফলে একই ভোটার কোনো একটি বিষয়ে ডানপন্থী অবস্থান নিলেও অন্য বিষয়ে মূলধারার ডানপন্থী দলের সঙ্গে তার মতের মিল নাও থাকতে পারে।

নারী ভোটারদের ভূমিকাও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে নারীরা তুলনামূলকভাবে নাইজেল ফারাজের রাজনৈতিক বার্তা ও নেতৃত্বকে কম সমর্থন করেন। ব্রিটিশ নির্বাচনী রাজনীতিতে নারী ভোটারদের অবস্থান প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ফারাজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই ভোটারগোষ্ঠীর মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে অভিবাসন প্রশ্নে ফারাজের কঠোর অবস্থানই তার বিরোধিতার প্রধান কারণ—এমন সরল ব্যাখ্যা গবেষণার ফলাফলে পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। ফারাজবিরোধী ভোটারদের অনেকেই অভিবাসন নীতি নিয়ে তার অবস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করেন না। বিশেষ করে ডানঘেঁষা কিছু ভোটারের কাছে রাজনৈতিক বক্তব্যের অশালীনতা, বিভাজন তৈরি করা ভাষা কিংবা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা অভিবাসন নীতির চেয়েও বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

এই পরিস্থিতি ব্রিটিশ সমাজে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। অভিবাসন ও বর্ণবাদবিরোধী রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে জনপরিসরের অবস্থান কতটা পরিবর্তিত হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে অনেক বিশ্লেষকের মধ্যে। রাজনৈতিক বিতর্কের ভাষা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু বক্তব্যও স্বাভাবিক রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে, যা কয়েক বছর আগেও অনেক বেশি বিতর্কিত হিসেবে বিবেচিত হতো।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় সম্ভবত ব্রিটেনের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের গভীর হতাশা। জরিপে অংশ নেওয়া ফারাজবিরোধী ভোটারদের একটি বড় অংশ মূলধারার রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যমের প্রতি অসন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন। এই অসন্তোষ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়; বরং পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি আস্থার সংকটের প্রতিফলন।

ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, চাকরি ও আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। এসব সমস্যা যখন দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকরভাবে সমাধান হয় না, তখন ভোটারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশা বাড়তে থাকে। সেই শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ পায় নতুন বা প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা রাজনৈতিক শক্তিগুলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাই শুধু নাইজেল ফারাজের বক্তব্যের সমালোচনা করলেই তার রাজনৈতিক প্রভাব কমবে না। তাকে বা তার দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হলে ভোটারদের হতাশার মূল কারণগুলোও সমাধান করতে হবে। সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে শুধু প্রচারণা বা রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে লেবার পার্টির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ক্ষমতায় থাকা বা মূলধারার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে রাজনৈতিক হতাশা আরও বাড়তে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, আবাসন সমস্যা মোকাবিলা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে অসন্তুষ্ট ভোটারদের একটি অংশ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারেন।

ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে এই রাজনৈতিক বাস্তবতা আবার এক রকম নয়। ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডে স্থানীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলো অনেক ভোটারের কাছে বিকল্প রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছে। কিন্তু ইংল্যান্ডে একই ধরনের একটি একক রাজনৈতিক বিকল্প নেই। ফলে সেখানে রিফর্ম ইউকের বিরোধী ভোটকে একত্রিত করা তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল হতে পারে।

বিভিন্ন আসনভিত্তিক রাজনৈতিক পূর্বাভাসে রিফর্ম ইউকের সম্ভাব্য সাফল্যের কথাও উঠে এসেছে। কিছু বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দলটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে সরকার গঠন বা প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনাও রাজনৈতিক আলোচনায় রয়েছে। তবে এসবই জনমত জরিপ ও রাজনৈতিক মডেলের ভিত্তিতে তৈরি পূর্বাভাস; নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফল যে এমনই হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সব মিলিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতির বর্তমান চিত্র একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তরুণ ভোটারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশা বাড়ছে। কেউ ফারাজের রাজনীতিকে সমর্থন করছেন, কেউ তার বিরোধিতা করছেন, আবার অনেকেই মূলধারার কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রতিই পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না।

এই আস্থাহীনতাই সম্ভবত ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকেত। ভোটারদের বড় একটি অংশ যখন মনে করেন তাদের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে প্রচলিত রাজনীতি যথেষ্ট কার্যকর নয়, তখন নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তাই ব্রিটেনের প্রধান দলগুলোর সামনে এখন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করার চ্যালেঞ্জ নয়; জনগণের হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনার আরও বড় দায়িত্ব রয়েছে।

নাইজেল ফারাজের রাজনৈতিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত হবে, তা ভবিষ্যতের নির্বাচনী ফলাফলই নির্ধারণ করবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ব্রিটেনের তরুণ ও হতাশ ভোটারদের মনোভাব বোঝা ছাড়া আগামী দিনের ব্রিটিশ রাজনীতির গতিপথ বোঝা কঠিন হবে। প্রচলিত রাজনীতির প্রতি এই অসন্তোষ যদি কার্যকর সমাধানের মাধ্যমে মোকাবিলা করা না যায়, তাহলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে আরও বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত