প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) পরবর্তী আসর আয়োজন না করার সম্ভাব্য ক্ষতি পোষাতে ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যান্য টুর্নামেন্টে ম্যাচ ফি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের ক্রিকেটাররা। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া ক্রিকেটারদের জন্য বাড়তি আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সব মিলিয়ে একজন ক্রিকেটারকে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।
ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে দেওয়া এই প্রস্তাব শুধু একটি মৌসুমের জন্য কার্যকর করার দাবি নয়। বরং ভবিষ্যতেও ম্যাচ ফি বাড়ানো এবং সেই বাড়তি সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেটারদের যুক্তি, বিপিএল না হলে দেশের পেশাদার ক্রিকেটারদের একটি বড় অংশের আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তাই বিসিবির অধীনে অনুষ্ঠিত অন্যান্য ঘরোয়া প্রতিযোগিতাগুলোকে আরও আকর্ষণীয় ও আর্থিকভাবে লাভজনক করে তোলা প্রয়োজন।
বর্তমানে বিসিবির আয়োজনে চারটি উল্লেখযোগ্য ঘরোয়া টুর্নামেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) চার দিনের সংস্করণ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের অংশ। পাশাপাশি বিসিএল ওয়ানডে এবং এনসিএল টি-টোয়েন্টিও অনুষ্ঠিত হয়। ক্রিকেটারদের প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব প্রতিযোগিতার ম্যাচ ফি এমন পর্যায়ে নেওয়া উচিত, যাতে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়েরা সারা বছর ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেও সম্মানজনক আয় করতে পারেন।
এর আগে প্রথম শ্রেণির দুই টুর্নামেন্টে ম্যাচ ফি বাড়ানো হয়েছিল। সর্বশেষ পরিবর্তনে ম্যাচপ্রতি ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৭৫ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা করা হয়। এবার ক্রিকেটাররা আরও বড় পরিসরে আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর দাবি তুলেছেন। তাদের লক্ষ্য শুধু ম্যাচপ্রতি পারিশ্রমিক বৃদ্ধি নয়, বরং ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর মধ্যেই অধিকসংখ্যক ক্রিকেটারকে নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি করা।
ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন জানিয়েছেন, আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কীভাবে দেশের ১৫০ থেকে ২০০ জন ক্রিকেটারকে আর্থিকভাবে উপকৃত করা যায়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোর ম্যাচ ফি একটি সম্মানজনক পর্যায়ে নেওয়া গেলে একজন খেলোয়াড় সারা বছর তুলনামূলক স্বচ্ছলভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন।
ক্রিকেটারদের এই দাবির পেছনে মূল বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ঘরোয়া ক্রিকেটে আয়ের সীমাবদ্ধতা। জাতীয় দলের বাইরে থাকা এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়া ক্রিকেটারদের জন্য সারা বছর পর্যাপ্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করা কঠিন। একটি মৌসুমে কয়েকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় খেলা না থাকলে তাদের আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ফলে ঘরোয়া ক্রিকেটকে শুধু জাতীয় দলের খেলোয়াড় তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে না দেখে ক্রিকেটারদের জীবিকা ও পেশাগত নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জোরালো হচ্ছে।
বিসিবিও ক্রিকেটারদের প্রস্তাবকে নেতিবাচকভাবে দেখছে না। বরং বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, ক্রিকেটারদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা তাদের নিজেদের চিন্তাতেও ছিল। টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর জানিয়েছেন, ক্রিকেটাররা দাবি না জানালেও তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি বোর্ডের বিবেচনায় ছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বোর্ডের লক্ষ্য হচ্ছে ঘরোয়া টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে একজন ক্রিকেটার যেন বছরে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলোয়াড়দের পেশাগত নিরাপত্তা বাড়বে এবং ক্রিকেটারদের খেলায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিসিএলের দুটি প্রতিযোগিতাকে নতুন কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক কাঠামোর আদলে দল বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অংশগ্রহণকারী ক্রিকেটারের সংখ্যাও বাড়বে। এর ফলে জাতীয় দলের বাইরে থাকা আরও বেশি ক্রিকেটার নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাবেন।
এই কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ক্রিকেটারদের আর্থিক সুবিধা বাড়াতে হলে বিসিবিকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে। তবে বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, টুর্নামেন্টগুলোর আয় বাড়ানো সম্ভব হলে ক্রিকেটারদের জন্য পারিশ্রমিক বাড়ানোকে বড় আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখা হবে না।
সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি পুরোনো টুর্নামেন্টকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এলে সেখান থেকে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, তিনটি টুর্নামেন্ট থেকে যদি ১৫ কোটি টাকা আয় করা যায়, তাহলে ক্রিকেটারদের জন্য ৫ কোটি টাকা ব্যয় করাও সম্ভব। অর্থাৎ বোর্ডের পরিকল্পনায় আয় ও ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিককে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে বিপিএল আয়োজন না করার বিষয়টি এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা হিসেবে বিপিএল ক্রিকেটারদের জন্য বড় আয়ের সুযোগ তৈরি করে। একটি বিপিএল মৌসুমে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। তাই কোনো কারণে এই টুর্নামেন্ট না হলে ক্রিকেটারদের একটি অংশের আয়ের ওপর তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেই জায়গা থেকেই ক্রিকেটাররা চান, বিপিএল না থাকলে বিসিবির অন্যান্য প্রতিযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা হোক। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে না, বরং ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতিযোগিতামূলক মানও বাড়তে পারে। বেশি ম্যাচ, বেশি দল এবং উন্নত পারিশ্রমিক থাকলে ক্রিকেটারদের দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
ক্রিকেটারদের ৩০ লাখ টাকার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বিসিবির ওপর আর্থিক দায় কতটা বাড়বে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ ১৫০ থেকে ২০০ ক্রিকেটারকে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে হলে টুর্নামেন্টগুলোর আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ম্যাচ ফি বাড়ালেই হবে না; প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, দর্শক আগ্রহ, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং অন্যান্য আয়ের পথও শক্তিশালী করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ক্রিকেটারদের দাবি এবং বোর্ডের পরিকল্পনার মধ্যে একটি মিল দেখা যাচ্ছে। উভয় পক্ষই চাইছে ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিসর বাড়ুক এবং বেশি সংখ্যক ক্রিকেটার আর্থিকভাবে লাভবান হোন। তবে প্রস্তাবের চূড়ান্ত কাঠামো, ম্যাচ ফি কত বাড়বে এবং কোন সময় থেকে তা কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে বিসিবির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
ক্রিকেটারদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু পারিশ্রমিকের প্রশ্ন নয়। দীর্ঘমেয়াদে মানসম্পন্ন ক্রিকেটার ধরে রাখা, তরুণ প্রতিভাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে আগ্রহী করা এবং জাতীয় দলের জন্য শক্তিশালী খেলোয়াড়ের ভিত্তি তৈরি করার সঙ্গেও বিষয়টি জড়িত। একজন ক্রিকেটার যদি ঘরোয়া পর্যায়ে নিয়মিত খেলে সম্মানজনক আয় করতে পারেন, তাহলে তার পেশাগত ক্যারিয়ার আরও টেকসই হওয়ার সুযোগ থাকে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে জাতীয় দলের সাফল্যের পেছনে ঘরোয়া কাঠামোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সেই বাস্তবতায় ম্যাচ ফি বৃদ্ধির প্রস্তাব নতুন করে ঘরোয়া ক্রিকেটের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
এখন দেখার বিষয়, ক্রিকেটারদের প্রস্তাব কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় এবং বিসিবি শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়। বিপিএল না থাকলেও যদি ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশি ম্যাচ, বেশি দল এবং উন্নত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সেটি দেশের ক্রিকেটের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। একই সঙ্গে বোর্ডের আয় বাড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্রিকেটারদের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং বিসিবির আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্যও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে, জনপ্রতি ৩০ লাখ টাকার প্রস্তাব শুধু বিপিএলের সম্ভাব্য ক্ষতি পোষানোর দাবি নয়; এর মধ্য দিয়ে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটারদের পেশাগত ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এখন ক্রিকেটারদের প্রত্যাশা এবং বোর্ডের পরিকল্পনা কতটা বাস্তব রূপ পায়, সেটিই হবে আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।