কোটি টাকা নিয়ে পালানো চালকসহ গ্রেপ্তার ৩

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
কোটি টাকা নিয়ে পালানো চালকসহ গ্রেপ্তার ৩

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি পোশাক কারখানার চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে এক কোটি টাকা নিয়ে পালানোর অভিযোগে গাড়িচালকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযানে নগদ ৯৭ লাখ ৩ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অর্থ উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।

গ্রেপ্তার তিনজন হলেন গাড়িচালক জাহিদ হাসান, তার মামা মো. আক্তারুজ্জামান এবং জাহিদের স্ত্রী নাসিমা আক্তার। জাহিদ ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু থানার কুলবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা। আক্তারুজ্জামুজ্জামান ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জাহিদের কাছ থেকেই উদ্ধার হয়েছে সবচেয়ে বেশি অর্থ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও অর্থ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চীনা ব্যবসায়ী ও ল্যাভেন্ডার ফ্যাশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান তার কারখানা থেকে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন। শ্রমিকদের বেতন ও কারখানার অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর জন্য গাড়িতে এক কোটি টাকা রাখা ছিল। পথে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় গাড়িটি থামানো হয়। ওই সময় গাড়িচালক জাহিদ হাসান টাকা নিয়ে গাড়ি থেকে সরে যান বলে অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পর গাড়িচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে যে গাড়িতে করে ওই অর্থ বহন করা হচ্ছিল, সেটিও উদ্ধার করা হয়। তবে গাড়িতে রাখা টাকার ব্যাগটি পাওয়া যায়নি। এরপর কারখানার প্রশাসন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আকরামুল ইসলাম রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেন।

ঘটনার পর বিষয়টি তদন্তে নামে শিল্প পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চালকের অবস্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়। পরে ঝিনাইদহে অভিযান চালিয়ে জাহিদ হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে নগদ ৮৬ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকা থেকে জাহিদের মামা আক্তারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে আরও এক লাখ ৩ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এরপর জাহিদের স্ত্রী নাসিমা আক্তারকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও ১০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৭ লাখ ৩ হাজার টাকা।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চুরি করা অর্থের একটি অংশ জাহিদ এরই মধ্যে খরচ করে ফেলেছিলেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে নতুন বাসা ভাড়া নেওয়া, আসবাবপত্র কেনা এবং একটি মোবাইল ফোন কেনার ব্যয় রয়েছে। পুলিশ এসব আসবাবপত্র ও মোবাইল ফোনও জব্দ করেছে।

ঘটনার পর চীনা ব্যবসায়ীর মোবাইল ফোনে জাহিদের পাঠানো একটি খুদে বার্তাও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেখানে তিনি নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন, তাকে এ কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি টাকা ফেরত দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন। বার্তাটিতে নিজের করা কাজকে বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করে আবেগঘন ভাষায় ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাড়িতে বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকার বিষয়টি চালকের জানা ছিল। সুযোগ বুঝে তিনি অর্থ নিয়ে পালিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানিয়েছেন, মামলার পর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনার একপর্যায়ে ঝিনাইদহ থেকে মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া অর্থ ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলাটি এখন তদন্তাধীন। তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা অর্থের হিসাব এবং বাকি অর্থ কোথায় রয়েছে, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য খরচের জন্য রাখা বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এভাবে গাড়ি থেকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা ও অর্থ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও তদন্তের বাইরে নয়।

ঘটনাটির আরেকটি দিক হলো, অভিযোগ ওঠার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশের অভিযানে মূল অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধার করা। এতে তদন্তে প্রযুক্তির ব্যবহার ও আন্তঃজেলা সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। ঝিনাইদহে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে অর্থ উদ্ধারের ঘটনাও তদন্তের অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।

তবে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরও প্রায় তিন লাখ টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি। সেই অর্থ কোথায় রয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ যুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে যদি আরও কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী মামলার আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

চালকের ওপর মালিকের আস্থার সুযোগ নিয়ে এত বড় অঙ্কের অর্থ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগটি এখন তদন্তের বিভিন্ন স্তরে যাচাই করা হচ্ছে। পুলিশের তদন্ত শেষ হলে ঘটনার পেছনের পরিকল্পনা, অর্থের গন্তব্য এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। আপাতত উদ্ধার হওয়া ৯৭ লাখ ৩ হাজার টাকা এবং গ্রেপ্তার তিনজনকে ঘিরেই তদন্তের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত