প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা কমে যাওয়ায় আট দিন পর কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে সবগুলো জলকপাট বন্ধ করা হয়। জলকপাট বন্ধের সময় হ্রদের পানির উচ্চতা ছিল ১০৪ দশমিক ৯৮ ফুট মিন সি লেভেল (এমএসএল)।
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্রদের পানির উচ্চতা ও পানির প্রবাহের পরিস্থিতি বিবেচনা করেই স্পিলওয়ের জলকপাট পরিচালনা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকায় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য গত ২৯ আগস্ট রাতে ১৬টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ধাপে জলকপাট দিয়ে পানি ছাড়ার পরিমাণও বাড়ানো হয়।
২৯ আগস্ট রাত ৮টার দিকে প্রথমে প্রতিটি জলকপাট ছয় ইঞ্চি করে খোলা হয়। তখন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হচ্ছিল। পরদিন হ্রদের পানির উচ্চতা আরও বাড়তে থাকায় জলকপাট খোলার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে ৩০ আগস্ট সকাল থেকে ১৬টি জলকপাট দিয়ে প্রায় তিন ফুট উচ্চতায় পানি ছাড়া হয়। এর ফলে হ্রদ থেকে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হয়।
পানির উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে এই প্রক্রিয়া ছিল মূলত কাপ্তাই বাঁধের জলব্যবস্থাপনার অংশ। বর্ষাকালে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা দ্রুত বেড়ে গেলে বাঁধের ওপর চাপ কমাতে স্পিলওয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর নিম্নাঞ্চলে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও নজরদারিতে রাখা হয়। এ সময় নদীর তীরবর্তী ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।
বর্তমানে হ্রদের পানির উচ্চতা আগের তুলনায় কমে আসায় স্পিলওয়ের সব কটি জলকপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে জলকপাট বন্ধ থাকলেও কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। কেন্দ্রটির পাঁচটি ইউনিট চালু রয়েছে এবং এসব ইউনিট থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ২২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য টারবাইনের মধ্য দিয়ে যে পানি প্রবাহিত হয়, তা কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে স্পিলওয়ের জলকপাট বন্ধ থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানি প্রবাহ অব্যাহত থাকে। কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি ইউনিট সচল থাকায় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি টারবাইনের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে।
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাত কমে আসার কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা ধীরে ধীরে কমেছে। সেই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই জলকপাটগুলো বন্ধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আবার জলকপাট খোলার প্রয়োজন হবে কি না, তা নির্ভর করবে হ্রদের পানির উচ্চতা, বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে আসা পানির প্রবাহের ওপর।
কাপ্তাই হ্রদের পানির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ১০৯ ফুট এমএসএল। জলাধারটির পানির উচ্চতা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ অতিরিক্ত পানি জমে গেলে বাঁধের নিরাপত্তা ও নিম্নাঞ্চলে পানির প্রবাহ—দুই দিকই বিবেচনায় রাখতে হয়। আবার অতিরিক্ত পানি দ্রুত কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নৌযান চলাচল এবং হ্রদনির্ভর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে কাপ্তাই হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রণ একটি ধারাবাহিক ও পরিস্থিতিনির্ভর প্রক্রিয়া।
কাপ্তাই বাঁধ শুধু দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা নয়, রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। বাঁধ নির্মাণের পর কর্ণফুলী নদীর ওপর গড়ে ওঠা কাপ্তাই হ্রদ দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলাধারে পরিণত হয়েছে। হ্রদকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, নৌপরিবহন, মাছ ধরা এবং পর্যটনসহ নানা কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে।
১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয় মূলত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে কাপ্তাই হ্রদের সৃষ্টি হয়। সময়ের সঙ্গে এই জলাধার রাঙামাটি অঞ্চলের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে টানা বৃষ্টির কারণে হ্রদের পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকায় জলকপাট খোলার প্রয়োজন হয়েছিল। কয়েক দিন পানি ছাড়ার পর এখন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হওয়ায় গেটগুলো বন্ধ করা হয়েছে। এতে হ্রদের পানি ধরে রাখার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়মিত উৎপাদনও চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে।
তবে বর্ষা মৌসুমের পুরো পরিস্থিতি এখনও আবহাওয়া ও উজানের পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত হলে হ্রদের পানির উচ্চতা আবার বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে পানি ব্যবস্থাপনার স্বার্থে স্পিলওয়ের জলকপাট পুনরায় খোলার প্রয়োজন হতে পারে। আর বৃষ্টিপাত কম থাকলে বর্তমান অবস্থায় জলকপাট বন্ধ রেখেই পানি সংরক্ষণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা, বাঁধের নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কর্ণফুলী নদীর নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়েই এখন নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জলকপাট বন্ধ হওয়ার ফলে আপাতত অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজন কমেছে। তবে আবহাওয়া ও হ্রদের পানির গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে পরবর্তী ব্যবস্থাপনার মূল বিষয়।