প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফেনীর লালপোল এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টে মো. আবদুল আলিম নামে এক কাস্টমস কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাতে মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে স্টার লাইন ফিলিং স্টেশনের পাশে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত আবদুল আলিম সিলেট কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট এলাকায় হলেও পরিবার বারইয়ারহাট পৌরসভা এলাকায় বসবাস করে। কর্মস্থল থেকে বাড়ির পথে থাকা অবস্থায় ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাত আনুমানিক ৮টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লালপোল এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। ওই সময় চট্টগ্রামমুখী লেনে একটি যাত্রীবাহী বাস চলাচল করছিল। বাসটির সামনে থাকা একটি পণ্যবাহী ট্রাক হঠাৎ ব্রেক করলে পেছনে থাকা বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। পরে বাসটি সড়কের বিভাজকের ওপর উঠে উল্টে যায়।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাসটি উল্টে যাওয়ার পর অনেক যাত্রী আহত অবস্থায় ভেতরে আটকা পড়েন। স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে উদ্ধারকাজে অংশ নেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের বাস থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নেয়।
উদ্ধার করা আহত যাত্রীদের দ্রুত ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অন্যরা স্থানীয় বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের আঘাত গুরুতর ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত আবদুল আলিমকেও উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন শেষে পরিবারের কাছে ফেরার পথেই তাঁর এমন আকস্মিক মৃত্যু স্বজনদের কাছে আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে।
নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবদুল আলিম কর্মস্থল সিলেট থেকে ছুটিতে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। সিলেট থেকে ট্রেনে ফেনীতে পৌঁছানোর পর মহিপাল এলাকা থেকে একটি বাসে করে বারইয়ারহাটের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই লালপোল এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হন।
বাসটির একজন যাত্রী জানান, বাসটির গতি তুলনামূলক বেশি ছিল। সামনে থাকা ট্রাকটি হঠাৎ ব্রেক করায় বাসচালক দ্রুতগতিতে চলন্ত গাড়িটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। এতে বাসটি সড়কের বিভাজকের ওপর উঠে উল্টে যায়। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুর্ঘটনার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে যান চলাচল ব্যাহত হয়। উল্টে যাওয়া বাসটি সড়কের ওপর পড়ে থাকায় ওই লেনে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। ফলে মহাসড়কের ওই অংশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেক যানবাহনকে ধীরগতিতে চলাচল করতে দেখা যায়। পরে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি সরিয়ে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
মহিপাল হাইওয়ে থানা-পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি সরিয়ে নিতে দুটি রেকার ব্যবহার করা হয়। বাসটি মহাসড়ক থেকে সরাতে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধারকাজ চালাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাসটি সরিয়ে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। যান চলাচল স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখার কাজও শুরু করেছে পুলিশ।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাসটির পেছনে থাকা ট্রাকটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ট্রাকটির চালককে শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার সময় বাসটির গতি কত ছিল এবং চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
নিহতের মরদেহ নিয়ে স্বজনদের আবেদনের বিষয়টিও বিবেচনা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। পরে স্বজনরা মরদেহ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
একজন কর্মজীবী মানুষের স্বাভাবিকভাবে পরিবারের কাছে ফেরার পথে এমন মর্মান্তিক পরিণতি আবারও মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং হঠাৎ ব্রেক করার ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় একটি প্রাণ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়। আবদুল আলিমের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দায়িত্ব পালন শেষে পরিবারের কাছে ফেরার যে যাত্রা ছিল, সেটিই শেষ যাত্রায় পরিণত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে স্বজনদের পাশাপাশি সহকর্মীদের মধ্যেও শোক নেমে এসেছে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে মহাসড়কে চলাচলের সময় চালকদের সতর্কতা, অতিরিক্ত গতি পরিহার এবং সামনে থাকা যানবাহনের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।