দুই দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫৮১ কোটি টাকা উত্তোলন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬১ বার
দুই দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫৮১ কোটি টাকা উত্তোলন

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পর প্রথম দুই দিনে ১৩ হাজার ৪২৮ জন গ্রাহক মোট ৫৮১ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনে ৭ হাজার ৮৯৬ জন গ্রাহক ৩২৭ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। এর আগের দিন সোমবার প্রথম দিনে ৫ হাজার ৫৩২ জন গ্রাহক ২৫৪ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। ফলে দুই দিনে গ্রাহকদের হাতে ফিরে গেছে ৫৮১ কোটি টাকা।

পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত নতুন এই ব্যাংক থেকে আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগকে ঘিরে গ্রাহকদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরুর পর সেটি ধীরে ধীরে বাস্তব লেনদেনের পর্যায়ে এসেছে। অনেক গ্রাহক দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা অর্থের একটি অংশ বা প্রয়োজনীয় অর্থ হাতে পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ব্যাংক শাখাগুলোতে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে। সংকটে থাকা এসব ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়ার পর নতুন ব্যাংকটির মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা শুরু হয়। পাঁচ ব্যাংকের সমন্বিত শাখা নেটওয়ার্কের সংখ্যা ৭৬১টি হওয়ায় দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

আমানত ফেরতের বর্তমান ধাপ শুরু হওয়ার আগে গত ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলনের আবেদন নেওয়া হয়। এ সময়ে ৭৪ হাজার ২২১টি আবেদন জমা পড়ে এবং এসব আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরতের দাবি ওঠে। আবেদনকারীদের মধ্যে কেউ জরুরি প্রয়োজনে অর্থ তুলতে চেয়েছেন, আবার কেউ নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে নিজেদের সঞ্চয়ের অর্থ হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে আবেদনকারীর সংখ্যা এবং বাস্তবে অর্থ উত্তোলনকারী গ্রাহকের সংখ্যা এক নয়। প্রথম দুই দিনের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, আবেদন করা মোট গ্রাহকের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক গ্রাহক সরাসরি অর্থ তুলেছেন। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কেউ আবেদন করার পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, কেউ প্রয়োজন অনুযায়ী আংশিক অর্থ তুলছেন, আবার কেউ ব্যাংকে অর্থ রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যাতে আবেদনকারী আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে তারল্য সংকট তৈরি না হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, কোনো যোগ্য আমানতকারী যেন অর্থ না পেয়ে ফিরে না যান, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই অর্থের সংস্থান করা হয়েছে।

অর্থ ফেরতের এই উদ্যোগ শুধু গ্রাহকদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় থাকা ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা মূলত নির্ভর করে প্রয়োজনের সময়ে নিজের আমানত কতটা সহজে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া যাচ্ছে তার ওপর। ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান কার্যক্রমকে সামনে রেখে গ্রাহকদের আচরণ ভবিষ্যতে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে আমানত ফেরতের পাশাপাশি অনলাইনে অর্থ স্থানান্তরের কার্যক্রমও চালু করা হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার সুযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সমস্যার কারণে যেসব গ্রাহক ব্যাংকিং সেবায় ভোগান্তির মুখে ছিলেন, তাঁদের জন্য ডিজিটাল লেনদেন চালু হওয়া স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হলেও একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সব শাখা এখনো পৃথক কাঠামোতেই পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ নতুন ব্যাংক গঠনের পরপরই পুরো শাখা নেটওয়ার্ককে একটি একক ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা হয়নি। ধাপে ধাপে ব্যবস্থাপনা, হিসাব, প্রযুক্তি, গ্রাহকসেবা ও অন্যান্য কার্যক্রম সমন্বয়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে একীভূত ব্যাংকগুলোর মালিকানা কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করে মালিকানা সরকারের হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের পথ তৈরি করা হয়েছে। তবে এই পুনর্গঠন কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন হবে, সেটিই এখন ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় প্রশ্ন।

বিশেষ করে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো, নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, খেলাপি ও অনাদায়ী ঋণ ব্যবস্থাপনা, তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী করা এবং নতুন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু আমানত ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে একটি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন আর্থিক শৃঙ্খলা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকদের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ।

বর্তমানে গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আবেদন অনুযায়ী অর্থ ফেরতের কার্যক্রম কতটা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যায়। প্রথম দুই দিনে ৫৮১ কোটি টাকা উত্তোলনের তথ্য থেকে বোঝা যায়, অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া বাস্তবে কার্যকর হয়েছে। তবে সামনে আরও বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। ফলে ব্যাংকের শাখাগুলোতে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ, দ্রুত যাচাই-বাছাই এবং গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংকিং খাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা তৈরি হতে দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু আস্থা নষ্ট হতে পারে খুব দ্রুত। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে তাই শুধু আমানত ফেরত দেওয়ার দায়িত্বই নয়, একই সঙ্গে নতুন একটি ব্যাংকিং কাঠামোর প্রতি গ্রাহকদের বিশ্বাস তৈরি করার দায়িত্বও রয়েছে। প্রথম দুই দিনের অর্থ উত্তোলন সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। আগামী দিনগুলোতে অর্থ ফেরতের ধারাবাহিকতা, লেনদেনের স্বাভাবিকতা এবং ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতাই নির্ধারণ করবে নতুন ব্যাংকটি কত দ্রুত স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com