গ্যাস-কয়লা সংকটে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভরসা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
গ্যাস-কয়লা সংকটে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভরসা

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ সংকটে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব এমন কেন্দ্রগুলো সচল রেখে লোডশেডিং কমানোর চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের সীমিত মজুত, আমদানি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ খাতের বড় অঙ্কের বকেয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে ৫৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এক মাসে ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টন ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন বলে হিসাব করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৫৩৮ মেগাওয়াট।

তবে প্রয়োজনের পুরো জ্বালানি একসঙ্গে পাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন চলতি মাসে এসব কেন্দ্রের জন্য প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থাৎ পিডিবির চাহিদার তুলনায় সরবরাহের পরিকল্পিত পরিমাণ কম। তাও ধাপে ধাপে সরবরাহ করা হবে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের বাস্তব সক্ষমতার একটি বড় ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে তেল কেনার অর্থ জোগান দেওয়াও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফার্নেস অয়েল কেনার জন্য গত সপ্তাহে পিডিবিকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এর মধ্যে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রকে প্রায় ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি ১ হাজার ৩০১ কোটি টাকা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে।

সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রই এই অর্থের আওতায় রয়েছে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সংগ্রহ ও উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কেন্দ্রগুলোর জন্যও জ্বালানি কেনার অর্থ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংকটের সময়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদনে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই বাড়তি নির্ভরতার পেছনে রয়েছে জ্বালানি খাতের সরবরাহ সংকট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন কমছে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতেও সরবরাহ ও উৎপাদন পরিস্থিতি সবসময় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে থাকছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হলে দ্রুত চালু করা যায় এমন তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর দিকে তাকাতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় ফার্নেস অয়েলের মজুত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর দিন শেষে সরবরাহযোগ্য ফার্নেস অয়েলের মজুত ছিল মাত্র ১৪ হাজার ৭৫১ টন। মাসের বাকি সময়ে আরও প্রায় ১ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় উৎস থেকে আরও ২৫ হাজার টন পাওয়ার কথা। তারপরও পিডিবির চাহিদা বিবেচনায় প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টনের ঘাটতি থেকে যেতে পারে।

এই ঘাটতি শুধু বিদ্যুৎ খাতের কারণে তৈরি হচ্ছে না। শিল্পসহ অন্যান্য খাতেও ফার্নেস অয়েলের প্রয়োজন রয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে সব খাত মিলিয়ে বিপিসি প্রায় ৩১ হাজার ৯০২ টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি করেছে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে প্রায় ৬ হাজার ৩৮০ টন তেল সরবরাহ হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি শিল্প খাতের প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

ফার্নেস অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সক্ষমতাও একটি সীমাবদ্ধতা। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ব্যবস্থায় মাসে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করা সম্ভব। এর বেশি আমদানি করতে হলে অতিরিক্ত অবকাঠামো ও খালাস সক্ষমতার প্রয়োজন হবে। ফলে হঠাৎ করে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে তেলের আমদানি দ্রুত বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ নয়।

এদিকে কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফার্নেস অয়েল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ঋণপত্র খুলেছে। তবে বিদেশ থেকে তেলবাহী চালান দেশে পৌঁছাতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। ফলে জরুরি মুহূর্তে এসব আমদানি তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না। স্বল্পমেয়াদে সরকারকে বিদ্যমান মজুত ও স্থানীয় সরবরাহের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হবে।

সংকট মোকাবিলায় আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া পাঁচটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রকে এমন একটি ব্যবস্থায় পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরবরাহ করার পর অর্থ পরিশোধ করা হবে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ ছাড়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে কেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করতে জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও কারিগরি প্রস্তুতি কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর তুলনামূলক বেশি খরচ। গ্যাস বা কয়লার তুলনায় ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বেশি হওয়ায় দীর্ঘ সময় এ ধরনের কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করলে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকিতে। অর্থাৎ লোডশেডিং কমানোর তাৎক্ষণিক সুবিধার পাশাপাশি সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপও তৈরি হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় অঙ্কের বকেয়া। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর হিসাবে, এসব কেন্দ্রের কাছে সরকারের বকেয়া প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র নিজস্ব অর্থে জ্বালানি কেনা ও উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সমস্যায় পড়ছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বকেয়া পরিশোধ করাও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। মঙ্গলবার জাতীয় গ্রিডে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৭৩ থেকে ২ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। বিকেল ৩টার দিকে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি ছিল। ওই সময় জাতীয় পর্যায়ে ১৬ হাজার ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশে মোট প্রায় ২ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি থেকে এসেছে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এই সরবরাহ দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। একই সময়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৮৬১ মেগাওয়াট এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৪ হাজার ৭২৪ মেগাওয়াট। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ১৫১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে। এর মধ্যে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ ছিল প্রায় ১ হাজার ২২০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি জটিল ভারসাম্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে সরকারকে। একদিকে গ্যাস ও কয়লার সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ায় দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো জরুরি, অন্যদিকে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে গেলে বাড়বে উৎপাদন ব্যয় এবং জ্বালানি আমদানির চাপ। তার ওপর রয়েছে সীমিত মজুত, আমদানি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলা করা গেলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে গ্যাস সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, কয়লার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে সমাধান করতে হবে। তা না হলে এক জ্বালানি সংকট থেকে আরেক জ্বালানি সংকটে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এবং সরকারের আর্থিক চাপ দুটিই বাড়তে পারে।

বর্তমানে সরকারের মূল লক্ষ্য লোডশেডিং কমিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্প উৎপাদন যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা। সে লক্ষ্যেই ব্যয়বহুল হলেও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু এই নির্ভরতা কতদিন স্থায়ী হবে এবং এর আর্থিক মূল্য কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত