প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজীপুরের শ্রীপুরে জলাবদ্ধ একটি গর্তের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ সাড়ে ছয় ঘণ্টার উদ্ধার তৎপরতা শেষে বিকেলে পানির নিচ থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর শোক ও উৎকণ্ঠা।
নিহত দুই শিশুর বয়সই নয় বছর। তাদের একজন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার মামুন মিয়ার ছেলে জুনায়েদ। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। অপর শিশু ইউসুফ মুন্সীগঞ্জের এমদাদুল হকের ছেলে। সে একটি মাদরাসায় পড়াশোনা করত। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শ্রীপুরের মুলাইদ ইলিমবাড়ি মোড় এলাকায় থাকা অবস্থায় তারা দুর্ঘটনার শিকার হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মুলাইদ ইলিমবাড়ি মোড় এলাকায় একটি গর্ত দীর্ঘদিন ধরে পানিতে তলিয়ে ছিল। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে গর্তটি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। পানির নিচে গর্তটির গভীরতা বা সীমানা স্পষ্টভাবে বোঝার সুযোগ না থাকায় সেখানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে দুই শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে।
শিশু দুটিকে আশপাশে না পেয়ে প্রথমে পরিবারের লোকজন নিজেরাই খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রাও তাদের সন্ধানে যুক্ত হন। একপর্যায়ে সন্দেহ করা হয়, জলাবদ্ধ গর্তের পানিতে তারা পড়ে যেতে পারে। পরে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে মাওনা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। স্থানীয়দের সহায়তায় পানিতে তল্লাশি চালানো হয়। পানির গভীরতা এবং জলাবদ্ধতার কারণে উদ্ধারকাজ সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালানোর পর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পানির নিচ থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া মাওনা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার খাইরুল আলম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তল্লাশি চালিয়ে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ বা দাবি না থাকায় মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শ্রীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শাহীনুর আলমও জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়ায় পরিবারের অবস্থানকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুই শিশুর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে স্থানীয়দের মধ্যে শোক নেমে এসেছে। স্বাভাবিকভাবে যে বয়সে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেই তাদের জীবন থেমে গেল একটি জলাবদ্ধ গর্তের পানিতে। পরিবারের সদস্যদের জন্যও ঘটনাটি নিঃসন্দেহে এক গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও খোলা গর্তকে কেন্দ্র করে শিশুদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে নির্মাণকাজ, মাটি কাটার পর তৈরি হওয়া গর্ত, পরিত্যক্ত পুকুর বা নিচু জায়গা পানিতে ডুবে গেলে সেগুলোর প্রকৃত গভীরতা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ফলে শিশুদের পাশাপাশি অসতর্ক পথচারীরাও দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
শ্রীপুরের এই ঘটনাও সেই ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। কোনো জায়গায় পানি জমে গেলে সেটি শুধু জলাবদ্ধতা হিসেবে না দেখে সেখানে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা শিশুদের চলাচলের আশপাশে এমন গর্ত থাকলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
একটি জলাবদ্ধ গর্তের অবস্থান, গভীরতা কিংবা সেখানে পানির নিচে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে—এসব তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নাও হতে পারে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানিতে জমির স্বাভাবিক আকৃতিও পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে কোনো শিশু খেলতে গিয়ে বা চলাচলের সময় অসাবধানতাবশত এমন স্থানে পড়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে বিপদ থেকে বের হয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিবার ও স্থানীয় মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় খোলা বা ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত থাকলে সেটি ঘিরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া, প্রয়োজনে বাঁশ বা বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া এবং সতর্কতামূলক চিহ্ন স্থাপন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে শিশুদের এমন জলাবদ্ধ বা অপরিচিত স্থানে একা না যাওয়ার বিষয়ে পরিবারকে সতর্ক থাকতে হয়।
শ্রীপুরের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় দীর্ঘ সময় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছেন। নিখোঁজ হওয়ার পরপরই স্থানীয়দের তৎপরতা এবং ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়ার বিষয়টিও উদ্ধার তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে শেষ পর্যন্ত দুই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, জলাবদ্ধ ওই গর্তটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং সেখানে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য আগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। এসব প্রশ্ন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি, তবু স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় ও গর্তগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এমন দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হতে পারে।
দুই শিশুর মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে থামিয়ে দেয়নি, এটি আশপাশের মানুষের জন্যও একটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। বর্ষার পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক জলাবদ্ধ স্থান হয়তো স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু পানির নিচে থাকা গর্ত বা গভীরতা তখনও বিপজ্জনক থাকতে পারে। তাই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
মঙ্গলবারের সেই দুর্ঘটনার পর মুলাইদ ইলিমবাড়ি মোড় এলাকায় নেমে এসেছে নীরবতা। কয়েক ঘণ্টার তল্লাশি শেষে যখন দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের জন্য সেটি ছিল এক হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা কেড়ে নিল দুইটি শিশুর জীবন, রেখে গেল তাদের পরিবার ও স্বজনদের জন্য অপূরণীয় শূন্যতা।