প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ উত্তেজনার দিকে মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর পর পাল্টা জবাব হিসেবে জর্ডানে মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে এমন একটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।
সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি হামলা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দামে পড়তে শুরু করেছে। বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি উঠে যায়।
ইরানের আইআরজিসি জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে এমন একটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। অন্যদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে দেশটির দিকে মোট ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১৮টি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে এবং দুটি জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়ে।
জর্ডানের সামরিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ও অন্যান্য অংশ যেখানে পড়েছে, সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ দল কাজ করছে। দেশটির জনগণকে ধ্বংসাবশেষ বা সন্দেহজনক কোনো বস্তুতে হাত না দেওয়ার জন্যও সতর্ক করা হয়েছে।
ইরানের হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতেও পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। আইআরজিসির দাবি, বুধবার তারা ওই এলাকায় ১০টি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে দুটি মার্কিন জাহাজ এবং আটটি তেলবাহী ট্যাংকার ছিল বলে জানিয়েছে ইরান। তাদের দাবি, এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালির একটি ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ’ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল।
তবে এই দাবির সব বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের সামরিক দাবি-পাল্টা দাবির মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলোর হিসাবে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালিটি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াত স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর আগে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করার ঘোষণা দেয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পরপর দুই দিন একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্য করার পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়। মার্কিন বাহিনী দাবি করেছে, যুদ্ধজাহাজটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলার আগে সংশ্লিষ্ট ট্যাংকারগুলোর ক্রুদের জাহাজ থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে ওমান উপসাগর এবং ইরানের খারগ দ্বীপের আশপাশে এসব জাহাজে হামলা চালানো হয়। খারগ দ্বীপ ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে হামলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, এসব তেলবাহী জাহাজ ইরানের বিপ্লবী গার্ড ও তাদের আঞ্চলিক সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় নেটওয়ার্কের অংশ। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও জানিয়েছেন, ইরান মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা বা হামলার চেষ্টা চালালে ওয়াশিংটন ইরানের তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে থাকবে।
অন্যদিকে ইরান বলছে, মার্কিন হামলার জবাব দেওয়া তাদের জন্য অনিবার্য। তেহরান এর আগেই সতর্ক করেছিল, ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। সর্বশেষ জর্ডানে হামলার মধ্য দিয়ে সেই হুমকির বাস্তবায়ন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ইরান একই সঙ্গে কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দর এলাকায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজগুলোর নাবিকদেরও সতর্ক করেছে। এসব জাহাজকে সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে তেহরান। ফলে পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলোতেও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হলে শুধু তেলের দাম নয়, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় দেড় শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় ৯৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে তেলের দাম ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতও যুক্ত হচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার কারণে সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকাতেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
এর আগে ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে একটি চালকবিহীন মার্কিন পানির নিচের ড্রোন জব্দ করার দাবি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য জানিয়েছে, ওই ড্রোনটি আগেই বিকল হয়ে গিয়েছিল এবং এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা গোপনীয় সামরিক সরঞ্জাম ছিল না। ঘটনাটিও দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। সামরিক স্থাপনা, তেলবাহী জাহাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একই সঙ্গে সংঘাতের আওতায় চলে আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দীর্ঘস্থায়ীভাবে ব্যাহত হলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা কোথায় গিয়ে থামবে। দুই পক্ষই নিজেদের সামরিক পদক্ষেপকে প্রতিরক্ষামূলক বা প্রতিশোধমূলক হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু প্রতিটি নতুন হামলার পর পাল্টা হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ায় আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এর মধ্যে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।