পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ২০৪ কোটি ডলার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৭ বার
পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ২০৪ কোটি ডলার

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিদেশি ঋণ পরিশোধে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে সরকার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেকোনো পাঁচ মাসের হিসাবে এটিই এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ বিদেশি ঋণ পরিশোধ।

ঋণ পরিশোধের এই রেকর্ড বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর বাড়তে থাকা চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে আগের বছরগুলোতে নেওয়া বড় প্রকল্প ও অবকাঠামোগত ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় শুরু হয়েছে, অন্যদিকে নতুন বিদেশি ঋণের অর্থছাড় ও প্রতিশ্রুতির প্রবাহ তুলনামূলকভাবে কমেছে। ফলে সরকারের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় এখন নিয়মিত পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট পরিশোধ করা ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের মধ্যে মূল ঋণ বা আসল বাবদ গেছে ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। আর সুদ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার। অর্থাৎ পাঁচ মাসে শুধু সুদ পরিশোধেই প্রায় ৭০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ৪০ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

গত বছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের মার্চ-জুলাই সময়ে পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অতিরিক্ত পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।

ঋণ পরিশোধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অবশ্য শুধু চলতি পাঁচ মাসের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে প্রায় ২৬৭ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ৩৩৭ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিশোধ আরও বেড়ে প্রায় ৪০৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

সবচেয়ে বড় চাপ দেখা গেছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ বাংলাদেশকে প্রায় ৪৪৯ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই পরিশোধ প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। সরকারি তথ্য ও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পুরোনো বড় প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়াই এই চাপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

বিগত এক থেকে দেড় দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এবং পরবর্তী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আসল পরিশোধে ছাড় বা গ্রেস পিরিয়ড ছিল। অনেক প্রকল্পের সেই সময়সীমা এখন শেষ হয়ে যাওয়ায় একসঙ্গে আসল ও সুদ পরিশোধ শুরু হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় সরকারের ঋণ পরিশোধের দায় দ্রুত বেড়েছে।

এর প্রভাব জুলাইয়ের পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সরকার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ৪৫ কোটি ৩২ লাখ ডলারের বেশি পরিশোধ করেছে। একই মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন বিদেশি ঋণ হিসেবে অর্থছাড় হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ ওই মাসে নতুন করে যত বিদেশি ঋণ এসেছে, তার তুলনায় পুরোনো ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় আড়াই গুণ।

এ ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের কাঠামোয় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। আগে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় এবং নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের প্রবাহ শক্তিশালী ছিল। এখন পুরোনো ঋণের কিস্তি বাড়ার পাশাপাশি নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় সরকারের জন্য প্রকল্প নির্বাচন, ঋণের শর্ত এবং অর্থনৈতিক সুফল বিবেচনা করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, আগের সময়ে নেওয়া বড় ঋণের দায় এখন পরিশোধের পর্যায়ে এসেছে। অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অবকাঠামো ও মেগাপ্রকল্পে ব্যাপক ঋণ নেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, ‘ভ্যালু ফর মানি’ এবং ঋণের সুদের হার যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

তিনি আরও বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন দায়ের কারণে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই দায় সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত বিদেশি ঋণ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে বিদেশি ঋণ নেওয়া নিজেই অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক বিষয় নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অবকাঠামো, শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ঋণের অর্থ এমন প্রকল্পে ব্যবহার করা হয় যেখান থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক বা সামাজিক সুফল পাওয়া যায় না, অথবা প্রকল্পের আয় বা উৎপাদনশীলতা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।

এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার নতুন বিদেশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, বিনিয়োগের প্রত্যাশিত রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক তথ্যেও নতুন বিদেশি ঋণের প্রবাহে কিছুটা সংযমের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থছাড়ও কমেছে। এর ফলে একদিকে পুরোনো ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবাহ কমে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ঋণ পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ পড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাতেও অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ঋণ পরিশোধের কারণে উন্নয়ন ব্যয় অতিরিক্ত সংকুচিত না হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণের মুদ্রা ও সুদের হার। আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বাড়লে পরিবর্তনশীল সুদের হারে নেওয়া ঋণের ব্যয় বাড়তে পারে। আবার স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তিত হলে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে সরকারের বেশি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা শুধু কত টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে তার হিসাব নয়; বরং কোন শর্তে, কোন মুদ্রায় এবং কী উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়া হয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই রেকর্ড পরিমাণ বিদেশি ঋণ পরিশোধ একদিকে সরকারের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, অন্যদিকে এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সতর্কবার্তাও। নিয়মিত ঋণ পরিশোধ দেশের আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে সহায়ক। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই না থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিশোধের চাপ তৈরি হতে পারে।

আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে, কিন্তু সেই বিনিয়োগ যেন ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতা বাড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা সংস্থান ধরে রাখতে হবে।

পাঁচ মাসে ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধের রেকর্ড তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় আর্থিক বাস্তবতা সামনে এনেছে। পুরোনো ঋণের দায় এখন দ্রুত পরিশোধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামনে সরকারের জন্য মূল পরীক্ষা হবে—এই দায় নিয়মিত পরিশোধের পাশাপাশি কীভাবে নতুন ঋণকে আরও উৎপাদনশীল, টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ কাজে ব্যবহার করা যায়। সেই ব্যবস্থাপনার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বৈদেশিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত