প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ব্যাট হাতে বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি বাংলাদেশ, শুরু থেকেই ছিল চাপ। একসময় মাত্র ৫৫ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে দলটি যখন বিপর্যয়ের মুখে, তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ব্যাটারদের সেই ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত পুষিয়ে দিয়েছেন বোলাররা। দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৬৯ রানে আটকে দিয়ে ৩৪ রানের জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। এই জয়ে নারী এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে নিগার সুলতানা জ্যোতির দল।
মঙ্গলবার দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘বি’ গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ছিল কার্যত বাঁচা-মরার লড়াই। সমীকরণ ছিল সরল—জিতলে সেমিফাইনাল, হারলে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়। এমন পরিস্থিতিতে টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা মোটেও স্বস্তির ছিল না বাংলাদেশের। তবে শেষ দিকে শারমিন আক্তার ও নাহিদা আক্তারের দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং পরে বোলারদের সম্মিলিত পারফরম্যান্সে কঠিন পরিস্থিতি থেকে ম্যাচ বের করে নেয় বাংলাদেশ।
প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুতেই ধাক্কা আসে। প্রথম ওভারেই কোনো রান না করে ফিরে যান দিলারা আক্তার। পরের ওভারে মাত্র ৩ রান করে সাজঘরে ফেরেন সোবহানা মোস্তারি। মাত্র ৮ রানে দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি ও জুয়াইরিয়া ফেরদৌস।
দুজন মিলে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও বড় জুটি হয়নি। ৩১ রান যোগ হওয়ার পর ১৬ রান করে ফিরে যান জুয়াইরিয়া। এরপর শারমিন আক্তার সুপ্তাকে সঙ্গে নিয়ে ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করেন নিগার। কিন্তু ১১তম ওভারে ২৩ রানে অধিনায়কের বিদায়ে বাংলাদেশের বিপদ আরও বাড়ে। এরপর দ্রুত ফিরে যান স্বর্ণা আক্তার ও ফাহিমা খাতুন। ১২ ওভার শেষে ৫৫ রানে ছয় উইকেট হারিয়ে তখন বড় ধরনের ব্যাটিং বিপর্যয়ে বাংলাদেশ।
এই অবস্থায় দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সপ্তম উইকেটের জুটি। শারমিন আক্তার সুপ্তা এবং নাহিদা আক্তার ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাট করে ইনিংসের গতিপথ বদলে দেন। চলতি টুর্নামেন্টে প্রথমবার একাদশে সুযোগ পাওয়া সুপ্তা নিজের দায়িত্বটা ভালোভাবেই পালন করেন। নাহিদাকে সঙ্গে নিয়ে দুজন ৪৩ বলে ৪২ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। এই জুটিই বাংলাদেশকে একশ রানের সীমা পার করার সুযোগ করে দেয়।
৩১ বলে তিনটি চারের সাহায্যে ৩৮ রান করেন শারমিন। নাহিদা আক্তার ২৬ বলে ১৬ রান করে অপরাজিত থাকেন। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১০৩ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। সেই মুহূর্তে স্কোরটি খুব বড় মনে হয়নি। বরং দুবাইয়ের মাঠে আমিরাতের ব্যাটাররা যদি শুরুতে দ্রুত রান তুলতে পারেন, তাহলে ম্যাচ বাংলাদেশের হাতছাড়া হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা শুরু থেকেই ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামেন। লক্ষ্য ছিল দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে আমিরাতের রান তোলার গতি আটকে দেওয়া। সেই পরিকল্পনার শুরুটা করেন মারুফা আক্তার। ইনিংসের প্রথম ওভারেই আমিরাত অধিনায়ক ইশা ওজাকে ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশের বোলাররা একের পর এক ডট বল করে আমিরাতের ব্যাটারদের ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন।
পাওয়ার প্লে শেষে আমিরাতের সংগ্রহ ছিল মাত্র ১৫ রান। চলতি টুর্নামেন্টে পাওয়ার প্লেতে এটি তাদের সবচেয়ে কম রান। বাংলাদেশের বোলিংয়ের নিয়ন্ত্রণ তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়। পঞ্চম ওভারে মারুফা নিজের দ্বিতীয় উইকেট তুলে নেন। সামাইরা ধরনিধরকাকে ফেরানোর পর আমিরাতের রান তোলার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এরপর আক্রমণে এসে রাবেয়া খান বাংলাদেশের জন্য ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্পেলগুলোর একটি করেন। তিনি রিনিথা রজথকে ফিরিয়ে আমিরাতের ব্যাটিংয়ে আরেকটি ধাক্কা দেন। পরে তীর্থ সতীশকে আউট করেন সুলতানা খাতুন। নাহিদা আক্তারও নিজের বোলিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেট তুলে নেন। ফলে একপর্যায়ে মাত্র ৩৮ রানেই পাঁচ উইকেট হারিয়ে বসে আমিরাত।
সেখান থেকে ম্যাচে ফেরার মতো কোনো বড় জুটি আর গড়তে পারেনি স্বাগতিক দল। হিনা হটচান্দানি ১৮ রান করে কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় রান তোলার গতি বাড়াতে পারেনি আমিরাত। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ৬৯ রানেই থেমে যায় তাদের ইনিংস। বাংলাদেশ জয় পায় ৩৪ রানে।
বাংলাদেশের বোলিংয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন রাবেয়া খান। চার ওভারে মাত্র ১৪ রান দিয়ে তিন উইকেট নিয়ে তিনি ম্যাচের অন্যতম সেরা পারফরমার। মারুফা আক্তার চার ওভারে মাত্র ৯ রান খরচ করে দুটি উইকেট নেন। নাহিদা আক্তারও চার ওভারে ১৮ রান দিয়ে দুটি উইকেট শিকার করেন। সুলতানা খাতুন ও ফাহিমা খাতুন একটি করে উইকেট নিয়ে দলের জয়ে অবদান রাখেন।
এই ম্যাচে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল চাপের মধ্যে বোলারদের কার্যকর পারফরম্যান্স। ব্যাটিংয়ে বারবার ধস নামলেও বোলিং ইউনিট পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষকে স্বস্তি দেয়নি। বিশেষ করে পাওয়ার প্লেতে কম রান দেওয়া এবং মাঝের ওভারগুলোতে নিয়মিত উইকেট তুলে নেওয়াই বাংলাদেশের জয়কে সহজ করেছে।
তবে সেমিফাইনালের আগে বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়ে চিন্তার জায়গা থেকেই যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আগের ম্যাচেও বাংলাদেশের ব্যাটিং খুব বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি। আমিরাতের বিপক্ষেও ১০৩ রানে থামতে হয়েছে। বড় দলের বিপক্ষে একই ধরনের ব্যাটিং বিপর্যয় হলে ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগ পাওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ব্যাটিং বিভাগকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪ পয়েন্ট। একমাত্র হারটি এসেছে শক্তিশালী শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। সেই ম্যাচেও বাংলাদেশের বোলাররা লড়াই করেছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত চার উইকেটে হেরে যায় দল। আমিরাতের বিপক্ষে জয় এনে দিয়েছে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থান এবং সেমিফাইনালের টিকিট।
অন্যদিকে ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনাল বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। ভারত গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখিয়ে শেষ চারে উঠেছে। হংকংয়ের বিপক্ষে বড় জয় এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে দাপুটে পারফরম্যান্স তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তাই বাংলাদেশের সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী নারী ক্রিকেট দল।
১০ সেপ্টেম্বর দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রথম সেমিফাইনাল। অন্য সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। দুই সেমিফাইনালের জয়ী দল খেলবে ১৩ সেপ্টেম্বরের ফাইনালে।
বাংলাদেশের জন্য এই সেমিফাইনাল শুধু আরেকটি ম্যাচ নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে নারী ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বড় সুযোগ। গ্রুপ পর্বে ব্যাটিং নিয়ে যে দুর্বলতা দেখা গেছে, তা কাটিয়ে উঠতে পারলে ভারতের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা সম্ভব। আর বোলিং ইউনিট যদি আমিরাতের ম্যাচের মতোই ধারাবাহিক থাকে, তাহলে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ তৈরি হবে।
আমিরাতের বিপক্ষে জয় তাই বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির হলেও কাজ শেষ হয়নি। বরং এখন শুরু হচ্ছে আরও কঠিন পরীক্ষা। ১০৩ রানের ছোট সংগ্রহকে ৩৪ রানের জয়ে পরিণত করে বাংলাদেশের মেয়েরা যে লড়াইয়ের মানসিকতা দেখিয়েছে, সেটিই সেমিফাইনালে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। এখন সেই লড়াইয়ের সঙ্গে ব্যাটিংয়ে আরও দৃঢ়তা যোগ করতে পারলেই ভারতের বিপক্ষে স্বপ্নের ফাইনালের দরজা খুলে যেতে পারে।