মাসের শেষে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ হতে পারে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
মাসের শেষে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ হতে পারে

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে নতুন রোগীর সংখ্যা, পাশাপাশি মৃত্যুও যোগ হচ্ছে আগের হিসাবের সঙ্গে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। সম্ভাব্য এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তিন মাসব্যাপী বিশেষ জনসচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে।

বুধবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সেমিনারে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঘরবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক হিসাবও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৮ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৫৭১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন নয়জন। এটি চলতি বছরে এক দিনে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা। এর ফলে চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার ৪৭৫ ছাড়িয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ জনে।

এর আগেও সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা একাধিকবার নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। ৬ সেপ্টেম্বর এক দিনে ১ হাজার ৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। আগস্ট মাসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল উল্লেখযোগ্য, তবে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংক্রমণের গতি আরও বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে আবহাওয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টিপাত, উষ্ণ তাপমাত্রা এবং বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে বৃষ্টির পর বিভিন্ন পাত্র, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ারসহ নানা স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মাতে পারে। ফলে শুধু বড় কোনো জলাবদ্ধতা নয়, বাড়ির আশপাশে অল্প পরিমাণ পানি জমে থাকাও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর সম্ভাব্য পিক সময় সামনে রেখে সরকার ইতোমধ্যে প্রস্তুতি জোরদার করেছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আক্রান্তের সংখ্যা কমানো এবং রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনা। এ জন্য প্রায় তিন হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু রোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ ধরনের প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেলে যাতে শয্যা সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত ডেঙ্গু শয্যা চালু রাখা হয়েছে। রোগীর চাপ আরও বাড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য শয্যা পুনর্বিন্যাস করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ডেঙ্গু চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্যালাইন ও পরীক্ষার কিটের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। বর্তমান রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহে ঘাটতি নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে চাহিদাও বাড়তে পারে। এ কারণে হাসপাতালগুলোকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও সম্ভাব্য পিক সময়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। রোগীর চাপ বাড়লে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো যাবে না বলেও সতর্ক করা হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় শয্যা রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের নতুন কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। এ উদ্দেশ্যে তিন মাসব্যাপী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সরকারি কর্মীদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এতে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নগর এলাকায় সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সমন্বয় করবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক ভবনগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভবনের ভেতরে মশার প্রজননস্থল তৈরি হলেও বাইরের কর্মীদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ সীমিত থাকে। ফলে ভবনের বাসিন্দাদের নিজেদের উদ্যোগে নিয়মিত পানি জমে থাকা স্থানগুলো পরিষ্কার করা জরুরি। শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়—এমন বার্তাই দিচ্ছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর কমে গেলেও পরবর্তী কয়েক দিন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে জ্বর কমে যাওয়াকে সম্পূর্ণ সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে দেশে অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রকোপও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে হাসপাতালগুলোর শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও পরীক্ষার সক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি কোথায় কীভাবে মশার প্রজনন হচ্ছে, সেটি চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ এবং অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহকে সম্ভাব্য সংক্রমণের সর্বোচ্চ সময় হিসেবে বিবেচনা করে এখন থেকেই প্রস্তুতি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। সামনে কয়েক সপ্তাহ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হয়ে উঠতে পারে। এই সময়ে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা পরিস্থিতির গতিপথে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে তাই শুধু হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা নয়, বাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও সাধারণ মানুষের। কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ এবং নিয়মিতভাবে সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরীক্ষা করার মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সরকার যখন সম্ভাব্য পিক সময় মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণই ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত