শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল নেপাল-তিব্বত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল নেপাল-তিব্বত

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ক্ষত এখনো শুকায়নি। এর মধ্যেই আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে নেপাল। মঙ্গলবার রাতে নেপালে ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগে তিব্বতেও ৫ দশমিক ৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ফলে পরপর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজির তথ্য অনুযায়ী, নেপালে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ৯টা ৩৮ মিনিটের দিকে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। সংস্থাটির পরবর্তী পর্যালোচিত তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ৫ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ২০১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ৯ কিলোমিটার।

অন্যদিকে একই দিনে তিব্বতেও ৫ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পের খবর পাওয়া যায়। ইউরোপিয়ান-মেডিটেরেনিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে আঘাত হানা ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। তাৎক্ষণিকভাবে এই ভূমিকম্পে নতুন করে বড় ধরনের প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

তবে ভূমিকম্পের খবর এমন এক সময়ে এসেছে, যখন নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চল এখনো কয়েক সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ধাক্কা সামলাচ্ছে। গত ২৬ আগস্ট বরফ, শিলা ও মাটির বিশাল ধসের পর প্রবল পানির স্রোত নেপালের বিভিন্ন এলাকা এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নদীর পানি হঠাৎ ফুলে উঠে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও যানবাহন ভাসিয়ে নেয়। একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ধারাবাহিকতা স্থানীয় মানুষের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বন্যার পর থেকে বহু পরিবার স্বজনের খোঁজে অপেক্ষা করছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতাও নানা বাধার মুখে পড়েছে। অনেক স্থানে রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দলকে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনাও কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষে আটকে পড়েছে।

সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ভয়াবহ। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫৭ জনে পৌঁছেছে এবং প্রায় ৫ হাজার ৩২৬ জন এখনো নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন। ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই দুর্যোগে তিব্বত অংশেও বহু মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোতে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনাও উদ্ধারকারী দল ও স্বজনদের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। দুর্গম টানেলগুলোতে আটকে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে অক্সিজেন সরবরাহ ও বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই অবস্থার মধ্যেই নতুন ভূমিকম্পের ঘটনা দুর্যোগপ্রবণ হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। নেপাল ও তিব্বত বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। হিমালয় পর্বতমালা গঠনের সঙ্গে যুক্ত ভূতাত্ত্বিক গতিশীলতার কারণে এই অঞ্চলে নিয়মিত ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ফলে একের পর এক ভূমিকম্প, ভূমিধস, হিমবাহের ধস এবং আকস্মিক বন্যা স্থানীয় মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

সাম্প্রতিক বন্যার কারণ নিয়েও বিজ্ঞানী ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভূমিকম্পের সঙ্গে বরফ ও শিলাধসের সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে মূলত হিমবাহ ও বরফ-শিলার ধসজনিত আকস্মিক বন্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণেও ঘটনাটির প্রকৃতি নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।

ভূমিকম্প ও বন্যার সমন্বিত প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে পাহাড়ি জনপদগুলোর ওপর। নদীর তীরবর্তী বসতি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সীমান্ত যোগাযোগপথ এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। অনেক পরিবারকে নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে হয়েছে। যারা এখনো নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান পাচ্ছেন না, তাদের জন্য প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটছে।

বন্যার ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে গত কয়েক দিনে কিছু আশাব্যঞ্জক ঘটনাও ঘটেছে। নেপালে একটি ধসে পড়া ভবনের নিচে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর একজন নারীকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনাও সামনে এসেছে। এমন ঘটনা নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে যে ধ্বংসস্তূপের নিচে বা দুর্গম স্থানে আটকে থাকা অন্যদেরও হয়তো জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব।

তবে নতুন ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকারী ও স্থানীয় প্রশাসনের সামনে আরও একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া পাহাড়ি অবকাঠামোতে নতুন কম্পনের প্রভাব কী হয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে পাহাড়ি ঢাল, ধসে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

নেপালের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি ভূমিকম্পের ঘটনা নয়; এটি পরপর কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মিলিত চাপ। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, ধ্বংস হওয়া যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সচল করার কাজ চলার মধ্যেই নতুন ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।

এদিকে তিব্বতেও ভূমিকম্প ও সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় দুই দেশের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার ওপরও ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রভাব রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, সীমিত যোগাযোগ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলছে।

নতুন ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চিত খবর পাওয়া না গেলেও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভূমিকম্পের পর পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

নেপাল-তিব্বত অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা এবং সীমান্তপারের সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দুর্যোগের পর উদ্ধার তৎপরতা নয়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অবকাঠামো, জনবসতি ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সবশেষে, নতুন ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও সাম্প্রতিক বন্যার ক্ষত এখনো স্পষ্ট। নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থার বাস্তবতা বলছে—এই অঞ্চলের সংকট এখনো শেষ হয়নি। নতুন ভূমিকম্প সেই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত