জয়পুরহাটে চাঁদা দাবির অভিযোগে সংঘর্ষ, আহত ১৩

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৭ বার
জয়পুরহাটে চাঁদা দাবির অভিযোগে সংঘর্ষ, আহত ১৩

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে মাছ চাষিকে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার রাতে উপজেলার নওটিকা পুকুরপাড় এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, নওটিকা এলাকার একটি পুকুরের মালিকানা ও মাছ চাষ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এর মধ্যেই ওই পুকুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। মঙ্গলবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে বিরোধের জেরে দুই পক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন।

ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর গুরুতর আহত চারজনকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

আহতদের মধ্যে নওটিকা গ্রামের শ্রী মুন্না, পলাশ, শহীদ, জিয়াউল ইসলাম, সুজাউল ইসলাম, সিহাব, মোরাদ হোসেন, কামরুল ইসলাম, আলহাজ্ব হাসান আলী, নূরুল আলম মণ্ডল, আবুল কাশেম ও তছলিম রয়েছেন। তাঁদের বয়স ১৭ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। সংঘর্ষে আহতদের কারও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছে বলে জানা গেছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত বগুড়ায় পাঠানো হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। পুকুরের লিজগ্রহীতা আব্দুল আলিম তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, পুকুরের মালিক সাজ্জাদের কাছ থেকে তিনি এক বছরের জন্য পুকুরটি লিজ নিয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী তিনি ওই পুকুরে মাছ চাষের জন্য মাছও ছেড়েছেন।

আব্দুল আলিমের অভিযোগ, একই পুকুরে অপর পক্ষও ক্ষমতার জোরে মাছ ছেড়েছে। এ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় এবং পরে পরিস্থিতি সংঘর্ষের দিকে গড়ায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুকুরের বৈধ দখল ও মাছ চাষের অধিকার নিয়েই মূল বিরোধ।

অন্যদিকে মাছ চাষি আলহাজ্ব হাসান আলী অভিযোগ করেছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নওটিকা পুকুরে মাছ চাষ করে আসছেন। সারা বছর পুকুরের মাছের পরিচর্যা, খাবার দেওয়া ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় তিনি অর্থ ও শ্রম ব্যয় করেছেন। মাছ বড় হওয়ার পর সম্প্রতি তিনি সেগুলো বিক্রি শুরু করেন। এ সময় তাঁর কাছে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।

হাসান আলীর দাবি, মোরাদ হোসেন ও আব্দুল আলিমের নেতৃত্বে তাঁর কাছে ওই টাকা দাবি করা হয়। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মাছ বহনকারী পিকআপে হামলা চালানো হয়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে উভয় পক্ষের লোকজন আহত হন।

তবে আব্দুল আলিম তাঁর বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে চাঁদা দাবির অভিযোগটি সত্য কি না এবং সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখছে।

ক্ষেতলাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুক্তারুল আলম জানিয়েছেন, সংঘর্ষের খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে কি না এবং ঘটনায় কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

স্থানীয়ভাবে পুকুরের মালিকানা, লিজ ও মাছ চাষের অধিকার নিয়ে বিরোধ নতুন কোনো বিষয় নয়। মাছ চাষে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। পুকুর প্রস্তুত করা, পোনা ছাড়া, মাছের খাবার, পরিচর্যা, শ্রমিকের মজুরি এবং মাছ বিক্রির সময় পরিবহনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে চাষিদের ব্যয় থাকে। ফলে মাছ বিক্রির মৌসুমে কোনো ধরনের বিরোধ তৈরি হলে তা দ্রুত উত্তেজনায় রূপ নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নওটিকার এই ঘটনাতেও পুকুরের মালিকানা ও মাছ চাষের অধিকার নিয়ে পুরোনো বিরোধের সঙ্গে আর্থিক দাবির অভিযোগ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, পুকুরের লিজসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংঘর্ষের আগে ও পরে কী ঘটেছিল, সেগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, একটি স্থানীয় বিরোধ শেষ পর্যন্ত ১৩ জনের আহত হওয়ার মতো সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে চারজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য জেলায় পাঠাতে হয়েছে। এমন ঘটনায় শুধু তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নয়, ভবিষ্যতে একই বিরোধ আবার সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও এ ধরনের সংঘর্ষ উদ্বেগের কারণ। একটি পুকুরের মাছ চাষ বা লিজ নিয়ে বিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। কিন্তু বিরোধ যখন সংঘর্ষে রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে রাতের বেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কে পুকুরটি বৈধভাবে লিজ নিয়েছেন, কার মাছ সেখানে ছিল, মাছ ধরার অধিকার কার ছিল, চাঁদা দাবির অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না এবং সংঘর্ষের সময় কারা কী ভূমিকা রেখেছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে আহত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি। গুরুতর আহত চারজনকে বগুড়ায় পাঠানো হয়েছে। তাঁদের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার অগ্রগতি পরিবারের সদস্যদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংঘর্ষে আহত অন্য ব্যক্তিদেরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা প্রয়োজন।

পুলিশ জানিয়েছে, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে সদস্যদের পাঠানো হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে যাতে একই বিরোধকে কেন্দ্র করে আবার উত্তেজনা বা সংঘর্ষ না হয়, সে জন্য স্থানীয়ভাবে বিরোধের কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পুকুরের মালিকানা ও লিজসংক্রান্ত বিরোধ থাকলে তা বৈধ কাগজপত্রের ভিত্তিতে নিষ্পত্তির পথ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

নওটিকার ঘটনায় চাঁদা দাবির অভিযোগ যেমন তদন্তের দাবি রাখে, তেমনি পুকুরের লিজ ও মাছ চাষের অধিকার নিয়ে দুই পক্ষের দাবিও যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষের অভিযোগকে তদন্ত ছাড়াই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ পর্যালোচনা করেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

একটি মাছের পুকুরকে ঘিরে শুরু হওয়া বিরোধ যাতে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি না করে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আহতদের চিকিৎসা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন সংঘর্ষ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ তদন্তে বেরিয়ে এলে এই ঘটনার পেছনে থাকা বিরোধও আইনি ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিষ্পত্তির পথ পেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত