ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াত-এনসিপির আলাদা লড়াই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াত-এনসিপির আলাদা লড়াই

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১-দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যের ব্যানারে একসঙ্গে পথ চললেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একে অপরকে ছাড় না দেওয়ার অবস্থানে রয়েছে দল দুটি। ফলে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ঐক্য অটুট রাখার পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনে একই জোটের শরিকদের মধ্যেই মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য ও দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নয়, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনেও ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলো নিজ নিজ প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে কোনো এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে শরিকদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে একক প্রার্থী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাতে বাধা দেবে না। অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিক আসন বা প্রার্থী ভাগাভাগির পরিবর্তে স্থানীয় বাস্তবতা ও প্রার্থীর সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১১-দলীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল। ঐক্যভুক্ত দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলোকে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী ঢাকার দুই সিটিতেও এনসিপি প্রার্থী দেবে এবং জামায়াতও নিজেদের প্রার্থী নিয়ে নির্বাচন করবে।

দলটির নেতারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হওয়ায় এখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো সরাসরি জোটগত আসন সমঝোতার প্রয়োজন নেই। ভোটাররা ব্যক্তি ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, পরিচিতি, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনসম্পৃক্ততাকে বিবেচনায় নিয়ে ভোট দিতে পারেন। এ কারণে স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ঐক্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় বলেই মনে করছে দলগুলো।

জামায়াতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বাছাই ও প্রস্তুতির কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। দলটির দাবি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্বশীল নেতাদের মাধ্যমে অধিকাংশ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ প্রার্থীর নাম ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলোর প্রার্থিতাও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে সব পর্যায়ের প্রার্থীর নাম একসঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের ঢাকা মহানগর আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠপর্যায়ে যোগাযোগ ও কার্যক্রম শুরু করেছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক, যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত, তাকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানা গেছে। তিনিও বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।

অন্যদিকে ঢাকার দুই সিটিতে এনসিপিও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা দক্ষিণে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রার্থিতা নিয়ে প্রস্তুতি চলছে। যদিও দলটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়নি।

স্থানীয় নির্বাচনে এনসিপির আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে দলটি। ফলে রাজধানীর দুই গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের পরিচিত ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের প্রার্থী করার মাধ্যমে সাংগঠনিক শক্তি এবং জনসমর্থনের বাস্তব চিত্র যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ১১-দলীয় ঐক্যের আরেক শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সমন্বয়ক মাওলানা হাসান জুনাইদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই সিটিতে তাদের কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। যাচাই-বাছাই শেষে প্রত্যেক সিটিতে একজন করে প্রার্থী চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এবি পার্টিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু জানিয়েছেন, ঢাকার দুই সিটিসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশনেও তাদের প্রার্থী থাকবে। যারা নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী এবং দলীয়ভাবে যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, তাদের সমর্থন দেওয়া হবে। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য স্তরেও দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা অনুযায়ী প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

তবে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপি এখনো স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী জানিয়েছেন, দলের সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে এলডিপি শেষ পর্যন্ত কোথায় এবং কতটা সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে একই রাজনৈতিক জোটের শরিকদের মধ্যে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হলেও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না দলগুলো। বরং নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক ঐক্যকে পৃথকভাবে দেখার চেষ্টা করছে তারা। দলগুলোর নেতারা বলছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তারা একসঙ্গে থাকবে।

বিশেষ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, জনদুর্ভোগ এবং অন্যান্য জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ইস্যুতে সম্মিলিত অবস্থান প্রয়োজন হলে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকরা একসঙ্গে মাঠে নামবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে শরিকদের মধ্যে কোনো প্রার্থী সমঝোতা হবে না। প্রত্যেক দল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও সক্ষমতা অনুযায়ী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে দুই বা একাধিক শরিক নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছালে কেন্দ্রীয়ভাবে তাতে বাধা দেওয়া হবে না।

এই অবস্থান স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন ধরনের সমীকরণের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। একই রাজনৈতিক জোটের অংশ হয়ে জাতীয় নির্বাচনে একসঙ্গে লড়াই করার পর স্থানীয় নির্বাচনে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়ার ঘটনা ভোটারদের জন্যও নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করবে। বিশেষ করে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে একাধিক শরিক দল প্রার্থী দিলে ভোটের হিসাব-নিকাশ আরও জটিল হতে পারে।

এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা দলটির স্থানীয় নির্বাচনী কৌশল ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এনসিপি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় এখানে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও প্রার্থীর নিজস্ব সাংগঠনিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তার মতে, এ কারণে জোটের ভোটের ওপর স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার প্রভাব জাতীয় নির্বাচনের মতো হবে না।

অন্যদিকে জামায়াতের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার ধারণা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি ও সাংগঠনিক সক্ষমতার দিক থেকে তাদের অনেক প্রার্থী এগিয়ে থাকবেন। ফলে শরিকদের সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থী সমঝোতার প্রয়োজন নেই বলেই তারা মনে করছেন। তবে ভোটের মাঠে প্রকৃত চিত্র কতটা ভিন্ন হয়, তা নির্বাচনী প্রচার ও ভোটের ফলাফলের পরই স্পষ্ট হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার দরজা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত অবশ্য দুই পক্ষের মধ্যে সম্পূর্ণ দূরত্ব তৈরি না হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোনো এলাকায় একজন প্রার্থী অন্যদের তুলনায় শক্তিশালী হলে স্থানীয় নেতারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে তাকে সমর্থন করতে পারেন। এতে একদিকে রাজনৈতিক ঐক্য বজায় থাকবে, অন্যদিকে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে নির্বাচনী কৌশলও গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

এদিকে ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। নির্বাচনের সময়সূচি প্রকাশিত হলে দলগুলোর প্রস্তুতি আরও দৃশ্যমান হবে। তখন সম্ভাব্য প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, প্রচার কার্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার চিত্রও পরিষ্কার হতে পারে।

সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ধরে রেখেও স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকরা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন হতে যাচ্ছে এই কৌশলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাক্ষেত্রগুলোর একটি। জামায়াত ও এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা যদি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকেন, তাহলে রাজধানীর ভোটের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। তবে নির্বাচনের আগে প্রার্থী চূড়ান্ত করা, স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা এবং ভোটারদের মনোভাব—এই তিনটি বিষয়ই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত