প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫তম বার্ষিকী পালন করা হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরোতে’ নিহতদের স্মরণে আবেগঘন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি ভেঙে তিনি নিউইয়র্কের মূল স্মরণানুষ্ঠানে না গিয়ে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির পেন্টাগনে গিয়ে হামলায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
নাইন-ইলেভেনের হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মরণানুষ্ঠানগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হয় নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটানের ‘গ্রাউন্ড জিরোতে’, যেখানে সন্ত্রাসী হামলায় সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেখানে নিহত ব্যক্তিদের স্বজন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চারটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই করে সন্ত্রাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালায়। এর মধ্যে দুটি উড়োজাহাজ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। আরেকটি উড়োজাহাজ আঘাত করে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে। চতুর্থ উড়োজাহাজটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। ওই হামলায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। নাইন-ইলেভেনের পর তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ শুরু করে। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে ইরাকে যুদ্ধ—দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এর গভীর প্রভাব পড়ে।
এবারের স্মরণানুষ্ঠানে নিউইয়র্কে উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্পের আগের চার জীবিত সাবেক প্রেসিডেন্ট। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হামলার সময় প্রেসিডেন্ট থাকা রিপাবলিকান নেতা জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা ও জো বাইডেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানটি শুরু হয় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের কিছু পর। নাইন-ইলেভেনের সেই ভয়াবহ দিনের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের নাম পড়ে শোনানো হয় এবং হামলার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো স্মরণ করে ঘণ্টা বাজানো হয়। স্বজনদের জন্য দিনটি ছিল গভীর শোক ও স্মৃতিচারণের।
প্রতি বছর এই অনুষ্ঠান সাধারণত রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে রাখা হয়। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা সেখানে তাঁদের প্রিয়জনদের নাম পড়ে শোনান। তবে এবার নাম পাঠ করা স্বজনদের কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলেন।
নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের অনুপস্থিতি তাই বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। যদিও তিনি একই দিনে পেন্টাগনে নাইন-ইলেভেনে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করেন এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পেন্টাগনও হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। ফলে সেখানে তার উপস্থিতিকে নিহতদের স্মরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী কর্মসূচি হিসেবে দেখা হয়েছে।
পেন্টাগনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প নাইন-ইলেভেনের নিহতদের স্মরণ করে বলেন, ২৫ বছর আগে তাঁদের স্মরণে যে শপথ নেওয়া হয়েছিল, তা আবার নতুন করে গ্রহণের সময় এসেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো নিহতদের ভুলবে না।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্য কেবল অতীতের স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গেও নাইন-ইলেভেনের স্মৃতিকে যুক্ত করেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক সংঘাত এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই এবং জয় ছাড়া অন্য কোনো ফল গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি দাবি করেন, তার দেশ শক্তভাবে লড়াই করছে এবং জয় অর্জনের লক্ষ্যেই লড়াই করছে। তার এই বক্তব্যকে অনেকে বর্তমান আন্তর্জাতিক ও সামরিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন।
নাইন-ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু করেছিল, সেটি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সম্পৃক্ততার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে অভিযান, আল-কায়েদার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অভিযান এবং ইরাক যুদ্ধ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
এসব যুদ্ধের মানবিক মূল্যও ছিল বিপুল। বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হন, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং বহু শহর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়। একই সঙ্গে এসব সামরিক অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
নাইন-ইলেভেনের ২৫তম বার্ষিকীতে তাই শুধু নিহতদের স্মরণই নয়, হামলার পরবর্তী ২৫ বছরের বিশ্ব রাজনীতির মূল্যায়নও সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করেছে, সেই নীতির সাফল্য ও ব্যর্থতা কী এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধগুলো দেশটির নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে—এসব প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ট্রাম্পের নিউইয়র্কের পরিবর্তে পেন্টাগনে যাওয়ার সিদ্ধান্তও এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের বাইরে নয়। পেন্টাগন নাইন-ইলেভেন হামলার অন্যতম লক্ষ্য হওয়ায় সেখানে তার উপস্থিতি একদিকে যেমন নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরার একটি বার্তাও বহন করেছে।
অন্যদিকে নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোর অনুষ্ঠানটি ছিল তুলনামূলকভাবে আবেগ ও ব্যক্তিগত স্মৃতিনির্ভর। সেখানে স্বজনেরা ২৫ বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি সামনে আনেন। অনেক পরিবারের কাছে সময় যতই পেরিয়ে যাক, প্রিয়জন হারানোর ক্ষত যে পুরোপুরি মুছে যায় না, অনুষ্ঠানটির আবেগঘন পরিবেশে সেটিই আবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নাইন-ইলেভেন হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বদলায়নি; বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। বিমানবন্দর নিরাপত্তা থেকে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা, সামরিক জোট থেকে অভিবাসন ও সীমান্তনীতি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ওই হামলার পর ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
২৫ বছর পরও সেই দিনের স্মৃতি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে গভীরভাবে জীবন্ত। নিহতদের নাম পাঠ, স্মৃতিসৌধে মানুষের নীরব উপস্থিতি এবং স্বজনদের আবেগঘন বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে সেই হারানোর গল্প। একই সঙ্গে নাইন-ইলেভেনের পর শুরু হওয়া যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর উত্তরাধিকার নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
এবারের বার্ষিকীতে ট্রাম্পের পেন্টাগন সফর এবং নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতি সেই স্মরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একদিকে গ্রাউন্ড জিরোতে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও নিহতদের স্বজনেরা অতীতের ভয়াবহতা স্মরণ করেছেন, অন্যদিকে পেন্টাগনে ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তা ও বর্তমান সামরিক বাস্তবতার সঙ্গে সেই স্মৃতিকে যুক্ত করেছেন। ফলে নাইন-ইলেভেনের ২৫তম বার্ষিকী হয়ে উঠেছে শোক, স্মৃতি, রাজনীতি এবং গত ২৫ বছরের বৈশ্বিক পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।