যুক্তরাষ্ট্রকে সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলল ইরান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
যুক্তরাষ্ট্রকে সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলল ইরান

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে তীব্র মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং কোন ধরনের সহিংসতাকে বৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

শুক্রবার গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এসব মন্তব্য করেন বাঘাই। নাইন-ইলেভেন হামলার বার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন। ইরানি মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের সঙ্গে দেশটির সামরিক কর্মকাণ্ড ও নীতির মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।

বাঘাই বলেন, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন চালাচ্ছে, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে; অন্যদিকে তারাই সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং কোন পক্ষের সহিংসতা বৈধ, তা নির্ধারণের একচ্ছত্র অধিকার দাবি করছে। তার মতে, একই সঙ্গে এ দুটি অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

নাইন-ইলেভেনের ঘটনা প্রসঙ্গেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানো ব্যক্তিরা ইরানি ছিলেন না। বরং তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরা ছিলেন, যাদের গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্নভাবে অস্ত্র, সংগঠন ও অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে গড়ে তুলেছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তার এই বক্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অতীত বৈদেশিক নীতি ও বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক নিয়ে ইরানের দীর্ঘদিনের অভিযোগেরই প্রতিফলন। বাঘাইয়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে, নাইন-ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র যে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল, তার ফলাফল নিয়েও তীব্র প্রশ্ন রয়েছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। এর পরপরই আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ইরাকেও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এসব অভিযানের ফলে ওই অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি হয়।

ইরানি মুখপাত্রের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ আফগানিস্তান ও ইরাকে বছরের পর বছর যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তার দাবি, এসব সংঘাতে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

নাইন-ইলেভেনের বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরার যে কোনো প্রচেষ্টারও সমালোচনা করেন বাঘাই। তিনি মনে করেন, এমন একটি ঘটনার স্মৃতিকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

বাঘাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের হত্যা এবং নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার মতো কর্মকাণ্ডকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করলেই তা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে একটি ‘অপরাধমূলক যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ইরানি মুখপাত্রের বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত, সামরিক উপস্থিতি, নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও জটিল হয়েছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং দেশটির সামরিক উপস্থিতির কঠোর সমালোচনা করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। ফলে দুই দেশের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রায় নিয়মিতই দেখা যায়।

নাইন-ইলেভেনের ঘটনাও দুই দেশের রাজনৈতিক বয়ানে ভিন্নভাবে উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা দেশটির আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাগুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করা হয়। ওই হামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং এর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সামরিক অভিযানগুলোর মানবিক ও রাজনৈতিক পরিণতি তুলে ধরে ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনা করে আসছে। ইরানের কর্মকর্তারা প্রায়ই যুক্তি দেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে পরিচালিত সামরিক অভিযান অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে এবং নতুন সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।

বাঘাইয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। তার বক্তব্যে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী নীতি, সামরিক অভিযান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহিংসতার বৈধতা নির্ধারণের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তবে ইরানি মুখপাত্রের এসব বক্তব্যকে তেহরানের সরকারি অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বাঘাইয়ের অভিযোগের বিপরীতে ওয়াশিংটনের অবস্থান কী, তা আলাদাভাবে বিবেচনার বিষয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য কেবল দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককেই প্রভাবিত করে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ, সামরিক অভিযান, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের পার্থক্য দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

ইসমাইল বাঘাইয়ের মন্তব্য সেই বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তার বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানের দাবি তখনই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, যখন একই মানদণ্ড সব পক্ষের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে। অন্যথায় সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকে বলে ইরানের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে।

নাইন-ইলেভেনের ২৫তম বার্ষিকীকে ঘিরে যখন সেই হামলার স্মৃতি ও এর পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নতুন করে আলোচনায় এসেছে, ঠিক সেই সময়েই ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে এমন কঠোর মন্তব্য করা হলো। ফলে বাঘাইয়ের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে সামনে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত