সরকারি ছুটি ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অফ ডে নয় : ত্রাণমন্ত্রী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫৮ বার
সরকারি ছুটি ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অফ ডে নয় : ত্রাণমন্ত্রী

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারি ছুটির বাইরে কোনো ‘অফ ডে’ রাখা হবে না বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেছেন, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক বছরের মধ্যেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় লালমনিরহাট জেলা শহরের চার্চ অব গড মিশন ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সদর উপজেলার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ কর্মসূচির সচেতনতামূলক প্রচার উপকরণ বিতরণ করা হয়।

শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করলেই শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং নির্ধারিত সময়ে পাঠদান নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

মন্ত্রী বলেন, অনেক সময় দুপুরের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই। শিক্ষার্থীরা কেন নেই জানতে চাইলে অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়, শিক্ষকও প্রতিষ্ঠানে নেই। শিক্ষকের উপস্থিতি না থাকলে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে থাকার আগ্রহও কমে যেতে পারে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে শৃঙ্খলা ও নিয়মিত কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা জরুরি।

শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, চাকরিতে যোগদানের সময় সরকারি ছুটির বাইরে অতিরিক্ত ছুটি ভোগের কোনো নিয়ম ছিল না। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম তৈরি হয়েছে। এখন এসব অনিয়ম থেকে বের হয়ে এসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নিতে হবে।

আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সরকারি ছুটির বাইরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ‘অফ ডে’ রাখা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান শেষ হওয়ার পর যেসব শিক্ষকের ওই সময়ে ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে না, প্রয়োজনে তাদের প্রশাসনিক ও অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষককে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারাও সরকারি ছুটির বাইরে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বের প্রয়োজনে তাদের কর্মস্থলে থাকতে হয় এবং বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। একইভাবে শিক্ষকদেরও নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি এবং কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও উপস্থিতি ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার মতে, শিক্ষক ও কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়াতেও ডিজিটাল হাজিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু উপস্থিতি নিশ্চিত করাই নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। প্রয়োজন হলে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ত্রাণমন্ত্রী আগামী এক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। তার মতে, শিক্ষার মানোন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। শিক্ষকরা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রশাসন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়, তাহলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি আনা সম্ভব।

লালমনিরহাটে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল শিক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি সমন্বিত উদ্যোগ। অনুষ্ঠানে জেলার সদর উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের হাতে সচেতনতামূলক লিফলেট ও ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ কর্মসূচির প্রচারপত্র তুলে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর লেখা ‘জাগো বাহে তিস্তা’ বইও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পাঠদানের কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং সচেতনতা গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পায়।

শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন শিক্ষার মান, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কার্যকারিতা এবং শিক্ষকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান গুরুত্বপূর্ণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়টি শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরিও জরুরি। একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক উপস্থিত থাকলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষক, উপযুক্ত অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, নিরাপদ পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পাঠদান ব্যবস্থা। তাই নিয়মিত উপস্থিতির সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ডিজিটাল হাজিরা ও সিসিটিভি স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির একটি নতুন কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শুধু উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

লালমনিরহাটের অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষকরা মন্ত্রীর বক্তব্য শোনেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল হক, পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, জেলা পরিষদের প্রশাসক একেএম মমিনুল হক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনোনীতা দাস, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রুখসানা পারভীন, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবিএম ফারুক সিদ্দিকসহ জেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।

সরকারি ছুটির বাইরে ‘অফ ডে’ না রাখার বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর সঙ্গে শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ, প্রশাসনিক দায়িত্ব, পাঠদানের সময়সূচি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থানীয় বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। নীতিগত নির্দেশনার পাশাপাশি কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিয়মিত, নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলাই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। শিক্ষকরা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন করলে এবং শিক্ষার্থীরাও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পাঠদানে অংশ নিলে শ্রেণিকেন্দ্রিক শিক্ষা আরও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি বাড়ানো গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

ত্রাণমন্ত্রীর ঘোষিত এক বছরের সময়সীমা তাই শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এই সময়ে শুধু উপস্থিতি নয়, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও দৃশ্যমান উন্নতি আসে কি না, সেটিই হবে উদ্যোগটির সাফল্যের বড় মাপকাঠি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com