প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীতে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে পুলিশের বিশেষ অভিযান, টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হলেও থামছে না মাদক কারবার। পুলিশের হিসাবে, গত এক মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন অভিযোগে ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। শুধু শুক্রবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৪২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তবু রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় প্রকাশ্যে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের মধ্যেও মাদক কারবারিদের সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু মাদক বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই রাজধানীর মাদক সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকা সরবরাহকারী, অর্থদাতা ও বড় কারবারিদের শনাক্ত করে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদকের চাহিদা কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ডিএমপি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অভিযানে মোট ৫৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ১৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তেজগাঁও বিভাগে ৯১ জন, ওয়ারী বিভাগে ৬০ জন, মতিঝিল বিভাগে ৫২ জন, উত্তরা বিভাগে ৪২ জন, গুলশান বিভাগে ৪১ জন, লালবাগ বিভাগে ২৮ জন এবং রমনা বিভাগে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া গোয়েন্দা বিভাগ থেকে ১২ জন এবং সিটিটিসি থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫১টি মামলা করা হয়েছে।
অভিযানকালে বিপুল পরিমাণ মাদকও উদ্ধার করা হয়েছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে ৩ হাজার ২৯১টি ইয়াবা এবং ৪৫ কেজি ৪৯০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি শটগানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের এই পরিসংখ্যান রাজধানীতে চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি বড় চিত্র তুলে ধরলেও মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। কারণ, একদিকে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তার চলছে, অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের পরও কীভাবে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকছে।
অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে চার শতাধিক শীর্ষ মাদক কারবারি রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে। এসব ব্যক্তি বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের তালিকা তৈরি করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশ বলছে, মাদক ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থার ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করাই এখন অন্যতম লক্ষ্য।
পুলিশের তালিকায় থাকা কয়েকজন শীর্ষ মাদক কারবারির বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দিলদার ও তার সহযোগী শাকিরসহ অন্তত ৩৫ জন সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক এনে রাজধানীতে বিক্রি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রমাণ ও তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিকে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবার নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ক্যাম্পের হুমায়ূন রোডসহ অন্তত ১২টি স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির ঘটনা ঘটে। ডিএমপির বিভিন্ন এলাকায় এমন চার শতাধিক মাদক বিক্রির স্পট রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেলগেট, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মগবাজার রেলগেট, পল্লবী, খিলগাঁও এবং উত্তর বাড্ডার কয়েকটি এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগের চিত্র সামনে এসেছে। কারওয়ান বাজার রেলগেট এলাকায় কয়েকজন কিশোর ও তরুণকে মাদক বহনের ব্যাগ নিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ক্রেতাদের কাছে ইয়াবা বিক্রির পাশাপাশি রেলগেটের আশপাশে বসেও মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পেও বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাতে ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রির দৃশ্য দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে। কোথাও কোথাও মাদক কেনার জন্য মানুষের সারি দেখা যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ক্যাম্পের আশপাশে পুলিশের একাধিক চেকপোস্ট রয়েছে এবং যৌথ বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
এখানেই মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিয়মিত অভিযান ও চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা চলে, তাহলে শুধু অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি ওই এলাকার মাদক সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ে গভীরভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। কারা মাদক সরবরাহ করছে, কোথা থেকে আসছে, কীভাবে অর্থ লেনদেন হচ্ছে এবং কারা এর পেছনে রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেনেভা ক্যাম্পসহ কিছু এলাকায় দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে মাদক কারবারিরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে। একটি এলাকায় যখন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকে এবং তরুণদের একটি অংশ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তখন অপরাধী চক্র তাদের নানা উপায়ে ব্যবহার করতে পারে। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যেতে পারে।
মাদক শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয় না; এর প্রভাব পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং বৃহত্তর সমাজেও পড়ে। মাদকের কারণে পরিবারে আর্থিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মাদকের বিস্তার থেকে সুরক্ষিত রাখা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে এর সামাজিক মূল্য আরও বেশি হতে পারে।
এ কারণে মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি; একই সঙ্গে যারা আসক্ত হয়ে পড়েছেন, তাদের চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ রাজধানীতে মাদক নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কঠোর অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ছাড় না দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে পুলিশের অভিযান আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সাফল্য পেতে হলে অভিযানকে ধারাবাহিক ও তথ্যভিত্তিক করার পাশাপাশি বড় কারবারিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া জরুরি। শুধু প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রেপ্তার করাই যদি অভিযানের প্রধান সাফল্যের মাপকাঠি হয়, তাহলে সরবরাহব্যবস্থার মূল জায়গাগুলো অক্ষত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মামলার তদন্ত, মাদকের উৎস শনাক্তকরণ, অর্থের প্রবাহ অনুসরণ এবং চিহ্নিত কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
রাজধানীর মানুষ চান নিরাপদ ও মাদকমুক্ত পরিবেশ। বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ এবং জনবহুল স্থানে মাদক বিক্রির অভিযোগ বন্ধ হলে পরিবার ও তরুণ প্রজন্মের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ একসঙ্গে কার্যকর হলে মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।
প্রতিদিন শত শত গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও রাজধানীতে মাদক কারবারের অভিযোগ অব্যাহত থাকা তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং একটি জটিল সামাজিক বাস্তবতাও সামনে নিয়ে এসেছে। এই বাস্তবতায় মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ তৈরি এবং আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ জোরদার করলেই দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীকে মাদকের বিস্তার থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।