প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তিনি বলেছেন, সবাই সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হবেন না, তবে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভিন্ন দায়িত্বে আসেন। তাই নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত র্যালির আগে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন রিজভী। এ সময় তিনি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
রিজভী বলেন, নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তাদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। তার মতে, নারীরা শুধু পরিবার বা সামাজিক পরিসরের অংশ নন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তাদের সমান ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, সবাই এমপি বা মন্ত্রী হবেন না। তবে জনগণের মধ্য থেকেই তাদের প্রতিনিধিরা এমপি-মন্ত্রী হন। সে কারণে সাধারণ মানুষও নেতৃত্বের অংশ। নারীদের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। নারীরা যদি শিক্ষা, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ আরও কার্যকর হতে পারে।
নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে তাদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নারীদের নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায় এবং পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। রিজভী বলেন, সমাজ থেকে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ মুছে দিতে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল কাজ করবে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। নারীরা শিক্ষায় এগিয়ে গেলেও কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। এ কারণে নারীর উন্নয়নকে শুধু একটি নির্দিষ্ট খাতের বিষয় হিসেবে না দেখে সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
রিজভী জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংগঠনটি অনেক ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় সংগঠনটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন পর্যায়ে ভূমিকা রেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেতাদের যোগ্যতা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে রিজভী বলেন, তারা অযোগ্য নন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তারাও সমানভাবে দক্ষ। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
নারীদের নেতৃত্বে অংশগ্রহণের বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। রিজভীর বক্তব্যেও নারীদের নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি এ সময় দলের নেতাকর্মীদের সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণকে জানানোর আহ্বান জানান। রাজনৈতিক কর্মীদের মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন কর্মসূচির বিষয়ে সাধারণ মানুষকে অবহিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রিজভী নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি নেতাকর্মীদের এই উদ্যোগের বিষয়ে জনগণকে অবহিত করার আহ্বান জানান।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা গেলে পরিবার ও সমাজে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়ে। আয় বা আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে নারীর আত্মবিশ্বাস, সন্তানের শিক্ষা ও পরিবারের কল্যাণের বিষয়গুলোও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নকে শুধু ব্যক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক উন্নয়নও জড়িত।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারের নারীদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নারীর জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে পরিবার পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রিজভীর বক্তব্যে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো অপরাধ শুধু একজন ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আঘাত হানে না, এর প্রভাব পুরো সমাজে পড়ে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, শিক্ষার প্রসার এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি সহমর্মী ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
নারীদের সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। একজন নারী যাতে নিজের শিক্ষা, পেশা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সব পর্যায়ে সহযোগিতা দরকার। একই সঙ্গে নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নারী শাখাগুলো এ ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে রিজভীর বক্তব্যে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে এসেছে।
নয়াপল্টনের এই কর্মসূচিকে ঘিরে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার পরিবেশ তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র্যালিকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা অংশ নেন এবং নারী অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিভিন্ন বিষয় সামনে আসে।
রিজভীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল নারীর সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বাড়ানো। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ বন্ধে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় নারীর অবদান এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, কৃষি, শিল্প এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এই অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত করতে হলে তাদের নিরাপদ পরিবেশ, সমান সুযোগ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নারীদের উন্নয়ন শুধু নারীদের জন্য নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, তাদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। রিজভীর বক্তব্যে সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই উঠে এসেছে।