সমতলে আনারস চাষ, ভালো ফলনে খুশি কৃষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ বার
সমতলে আনারস চাষ, ভালো ফলনে খুশি কৃষক

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাটোরের বড়াইগ্রামে সমতল জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করে সাড়া ফেলেছেন কৃষক রফিকুল ইসলাম। পাহাড়ি এলাকার ফল হিসেবে পরিচিত আনারস এবার ফলছে বড়াইগ্রামের মল্লিকপুর গ্রামের সমতল জমিতে। ভালো ফলন, স্বাদ ও বাজারদর পাওয়ায় প্রথমবারের মতো আনারস চাষ করেই আশাবাদী হয়ে উঠেছেন এই কৃষক। তার বাগানের সফলতা দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা সেখানে আসছেন।

বড়াইগ্রাম উপজেলার মল্লিকপুর বিলে প্রায় ১০ কাঠা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলেছেন রফিকুল ইসলাম। বাগানে সারি সারি গাছে ঝুলছে পাকা ও আধাপাকা আনারস। কোনোটি হলুদাভ রঙ ধারণ করেছে, আবার কোনোটি এখনও সবুজ। গাছের ফাঁকে ফাঁকে পরিচর্যা করতে দেখা যাচ্ছে কৃষক রফিকুলকে। স্থানীয়দের কাছে দৃশ্যটি যেমন নতুন, তেমনি কৃষির সম্ভাবনা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ।

রফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় তিন বছর আগে বাজার থেকে আনারস কেনার সময় তার মাথায় এই ফল চাষের চিন্তা আসে। পাহাড়ি অঞ্চলে আনারসের চাষ ব্যাপক হলেও সমতল এলাকায় এর বাণিজ্যিক চাষ কতটা সম্ভব, তা নিয়ে তারও শুরুতে সংশয় ছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকলে প্রায় দেড় বছর আগে টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে তিনি দেড় হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। সেগুলো এনে নিজের জমিতে লাগানোর পর শুরু হয় নতুন এক কৃষি অভিযাত্রা।

চারা লাগানোর পর সব গাছ টিকে থাকেনি। কিছু চারা মারা গেছে, আবার কিছু গাছে এবার ফলও আসেনি। তবে বেঁচে থাকা গাছগুলোর মধ্যে প্রায় এক হাজার গাছে আনারস ধরেছে। বাগানে ‘ক্যালেন্ডার’ ও ‘জায়েন্ট কিউ’ জাতের আনারস চাষ করা হয়েছে। প্রথমবারের ফলনেই ভালো সাড়া পাওয়ায় আগামী দিনে এই চাষ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন রফিকুল।

কৃষক জানান, আনারসের চারা জমিতে লাগানোর প্রায় এক বছর পর ফুল আসতে শুরু করে। ফুল আসার পর চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে ফল পাকতে শুরু করে। চলতি মৌসুমে তার বাগানের অধিকাংশ গাছে প্রথমবারের মতো ফল এসেছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু আনারস পেকে যাওয়ায় তিনি সেগুলো বাজারে বিক্রি করেছেন। মাঝারি আকারের ফলগুলো দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি স্বাদেও বেশ মিষ্টি হওয়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

রফিকুলের হিসাবে, আনারস চাষে তার প্রাথমিক বিনিয়োগও তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। দেড় হাজার চারা সংগ্রহ করে বাড়ি পর্যন্ত আনতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা। চার দফা নিড়ানি দিতে আরও ছয় হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সার ও কীটনাশকের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার টাকা। সেচ বাবদ ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৬০০ টাকা। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত বাগান পরিচর্যায় তার খরচ তুলনামূলকভাবে সীমিত রয়েছে।

এরই মধ্যে বাগান থেকে ৫০০টি আনারস বিক্রি করেছেন রফিকুল। প্রতিটি আনারস গড়ে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। বাগানে এখনও তিন শতাধিক আনারস রয়েছে। এগুলো পরিপক্ব হয়ে বাজারে বিক্রি করা গেলে আয় আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। একই সঙ্গে পরবর্তী বছরগুলোতে উৎপাদন খরচ কমে আসার সম্ভাবনা থাকায় লাভের পরিমাণও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন এই কৃষক।

তবে নতুন ধরনের ফসল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সমস্যার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে। কৃষি বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় আনারসের পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে শুরুতে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। একপর্যায়ে তার বাগানে গোড়া পচা রোগ দেখা দেয়। এতে কিছু গাছ নষ্ট হয়ে যায়। পরে প্রয়োজনীয় পরিচর্যার মাধ্যমে বাগানের বাকি গাছগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন তিনি।

ফসল ভালো হওয়ার পাশাপাশি রফিকুলের জন্য নতুন একটি সমস্যাও তৈরি হয়েছে। রাতের আঁধারে তার বাগান থেকে শতাধিক পাকা আনারস চুরি হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাগান পাহারা দেওয়ার বাড়তি চাপও তৈরি হয়েছে। তারপরও ভালো ফলন ও বাজারদর পাওয়ায় আনারস চাষ নিয়ে তার আগ্রহ কমেনি।

রফিকুল জানান, একটি আনারস গাছ থেকে একবার ফল পাওয়ার পরও পরবর্তী কয়েক বছর ফলন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রথমবারের মতো জমি প্রস্তুত ও চারা লাগানোর খরচের পর ভবিষ্যৎ মৌসুমে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে। এ কারণে পরবর্তী বছরগুলোতে একই জমি থেকে আরও ভালো আয় করার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।

মল্লিকপুরের এই বাগান শুধু রফিকুলের নিজের জন্য আয়ের উৎস হয়ে ওঠেনি, এটি স্থানীয় অন্য কৃষকদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করেছে। আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা বাগান দেখতে আসছেন। গোপালপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং ভরতপুর গ্রামের কৃষক আকবর আলী জানান, তারা আগে মনে করতেন আনারস মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের ফসল। সমতল জমিতে এত ভালোভাবে আনারস চাষ হতে পারে, তা তাদের কাছে সহজে বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। পরে মল্লিকপুরের বাগানে এসে নিজের চোখে ফলন দেখেছেন এবং আনারস কিনেও খেয়েছেন। তাদের মতে, ফলগুলোর স্বাদ বেশ ভালো।

স্থানীয় কৃষকদের কাছে এই বাগানের আরেকটি আকর্ষণ হলো, বড়াইগ্রামের মতো সমতল এলাকায় আনারস চাষের সম্ভাবনা নতুন করে সামনে আসা। কোনো নতুন ফসলের সফল উৎপাদন সাধারণত আশপাশের কৃষকদের বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে উৎসাহিত করে। রফিকুলের বাগানও সেই ধরনের আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে চাষে যাওয়ার আগে মাটি, আবহাওয়া, রোগবালাই, বাজারজাতকরণ এবং উৎপাদন ব্যয় সম্পর্কে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব আল মারুফ জানান, বড়াইগ্রামের মাটি ও আবহাওয়া আনারস চাষের জন্য উপযোগী বলেই প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। উপজেলায় এই ফল চাষে পাওয়া সাফল্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে কৃষি বিভাগ। কৃষকদের আনারস চাষে উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

কৃষি বিভাগের এমন সহযোগিতা পেলে স্থানীয়ভাবে আনারস চাষ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যেসব জমিতে প্রচলিত ফসল চাষে কৃষকের প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না, সেখানে উপযোগিতা যাচাই করে বিকল্প ফল চাষের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য নিয়মিত কৃষি পরামর্শ, মানসম্মত চারা সরবরাহ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রফিকুল ইসলামের আনারস বাগানের গল্প তাই শুধু একজন কৃষকের ভালো ফলনের গল্প নয়; এটি সমতল এলাকার কৃষিতে নতুন ফসল নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার একটি উদাহরণও। বাজারের একটি সাধারণ ফল কেনার আগ্রহ থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগ দেড় বছরের ব্যবধানে তাকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের অভিজ্ঞতা দিয়েছে। প্রথমবারের ফলন ও বিক্রিতে সন্তুষ্ট এই কৃষক এখন ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আনারস চাষের সম্ভাবনা দেখছেন।

তার বাগানে ফলন অব্যাহত থাকলে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে বড়াইগ্রামের অন্য কৃষকরাও এ ধরনের চাষে আগ্রহী হতে পারেন। আর কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তা ও স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে এই সম্ভাবনা আরও বাস্তব রূপ পেতে পারে। পাহাড়ের ফল হিসেবে পরিচিত আনারস যদি নাটোরের সমতল মাটিতে নিয়মিতভাবে কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে, তাহলে তা স্থানীয় কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত