আসিফ মাহমুদ ও স্ত্রীর সম্পদের তথ্য চাইল দুদক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
আসিফ মাহমুদ ও স্ত্রীর সম্পদের তথ্য চাইল দুদক

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তাঁর স্ত্রী আয়েশা আক্তার পান্নার দেশ-বিদেশের সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার দুদকের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে।

দুদকের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আসিফ মাহমুদ, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছে। দেশে থাকা ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁদের নামে থাকা বিভিন্ন ধরনের হিসাব, বিনিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যও এই অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। তবে তথ্য চাওয়া বা অনুসন্ধান শুরু হওয়া কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই দুদক অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

দুদকের নথিতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, দেশি-বিদেশি কোম্পানি গঠন, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্টদের আর্থিক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিএফআইইউর কাছে পাঠানো চিঠিতে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলমান, বন্ধ বা সুপ্ত হিসাবের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের আমানত, ঋণ, এফডিআর, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য আর্থিক পণ্যের তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং লেনদেনের ধরন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথিপত্রও অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

শুধু দেশের আর্থিক কর্মকাণ্ড নয়, বিদেশে থাকা সম্ভাব্য সম্পদ ও বিনিয়োগের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। চিঠিতে পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডের মতো বিভিন্ন স্থানে জমি কেনা, বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাব এবং অর্থপাচারের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। এসব দেশের সংশ্লিষ্ট আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

বিদেশে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ কিংবা ব্যাংক হিসাব রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের প্রয়োজন হয়। ফলে দুদকের বর্তমান উদ্যোগ শুধু দেশের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; অভিযোগে উল্লিখিত বিদেশি সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ও যাচাইয়ের আওতায় আনা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে দুদক। এর আগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছিল। পরে নতুন করে আরও কিছু অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচারসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই সময় সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুসন্ধানের আওতায় নেওয়া হয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা এটিও জানিয়েছেন যে অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

নতুন অভিযোগগুলোর মধ্যে সিটি করপোরেশনে নিয়োগ, জেলা প্রশাসক পদায়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, ঘুষ ও অর্থপাচারের বিষয় রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের আর্থিক দিক যাচাই করতেই বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দুদকের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় আর্থিক নথি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন বা অর্থপাচারের অভিযোগ উঠলে তাঁর আয়, সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, বিনিয়োগ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে সম্পদের উৎস এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিও যাচাই করা হতে পারে।

আসিফ মাহমুদের ক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রী এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এর ফলে অনুসন্ধানের পরিধি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত হিসাবের মধ্যে সীমিত থাকছে না। পারিবারিক ও ব্যবসায়িকভাবে সংশ্লিষ্ট আর্থিক কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের অংশ হতে পারে।

বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগ যাচাই করা দুদকের জন্য তুলনামূলকভাবে জটিল একটি প্রক্রিয়া। কারণ এ ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশের নথি পর্যালোচনা করলেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যাংক, কোম্পানি নিবন্ধনকারী কর্তৃপক্ষ, সম্পদ নিবন্ধন সংস্থা কিংবা আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। তাই বিএফআইইউর মাধ্যমে তথ্য চাওয়ার বিষয়টি অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে কোনো দেশে সম্পদ বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেলেই তা অবৈধ সম্পদের প্রমাণ হয়ে যায় না। সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস, লেনদেনের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক—এসব বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়। একইভাবে বিদেশে কোনো কোম্পানি বা বিনিয়োগের অস্তিত্ব থাকলেও তার প্রকৃতি ও অর্থের উৎস তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

আসিফ মাহমুদ বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানের খবর রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে অনুসন্ধানটি একটি আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে এবং অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভরশীল।

দুদকের বর্তমান উদ্যোগের পরবর্তী ধাপে বিএফআইইউ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হতে পারে। দেশি ও বিদেশি সম্পদের তথ্য, ব্যাংক লেনদেন এবং অন্যান্য আর্থিক নথি পর্যালোচনার পর অভিযোগগুলোর সঙ্গে সেগুলোর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। প্রয়োজন হলে আরও নথি সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হতে পারে।

এদিকে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযোগকারী বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আইনগতভাবে সঠিক নয়। অনুসন্ধানের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে অভিযোগের ভিত্তি কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিই নির্ধারণ করা হয়।

আসিফ মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদের তথ্য চাওয়ার মধ্য দিয়ে দুদকের অনুসন্ধান এখন আর্থিক লেনদেন ও দেশ-বিদেশের সম্পদ যাচাইয়ের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দেশের ব্যাংক হিসাব থেকে শুরু করে বিদেশি সম্পদ, বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড—সবকিছু মিলিয়ে একটি বিস্তৃত তথ্যচিত্র তৈরির চেষ্টা চলছে।

এখন মূল বিষয় হলো, বিএফআইইউসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে কী ধরনের তথ্য পাওয়া যায় এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে দুদক পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়। অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চাওয়ার এই উদ্যোগ আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানকে আরও বিস্তৃত পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত