ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব ঢাকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৮ বার
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব ঢাকার

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্যে ঢাকার পক্ষ থেকে সম্পর্ককে আরও বাস্তবভিত্তিক, পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর ও সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে করা বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো, বাণিজ্য ও যোগাযোগ সহযোগিতা এবং পানি ও সীমান্তের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর ১৩ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’ করতে চায় এবং নতুন ধরনের দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে সরাসরি আলোচনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগই গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সীমান্তে হত্যাকাণ্ডসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্বেগ কূটনৈতিক চ্যানেলে আন্তর্জাতিক আইন, সীমান্ত প্রটোকল ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আলোকে উত্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

এর আগে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছিলেন, আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। ১১ সেপ্টেম্বর সংসদীয় অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সবগুলো চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং পর্যালোচনার ফলাফল শিগগিরই জানানো হবে। তবে কোন চুক্তি বহাল থাকবে, কোনটিতে সংশোধন আনা হবে বা কোনোটি বাতিল করা হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনাও এই পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ। তবে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনা করা হচ্ছে—এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে সবগুলো চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। বরং সরকারের বর্তমান অবস্থান হলো, প্রতিটি সমঝোতা ও চুক্তির বিষয়বস্তু এবং বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য যাচাই করা। কোনটির ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা পর্যালোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

বাংলাদেশের জন্য এই পর্যালোচনার অর্থনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে স্থল, নৌ ও রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সংযোগের মতো বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। ফলে সম্পর্কের কোনো একটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হলে তার প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। এ কারণে চুক্তিগুলোর মূল্যায়ন কেবল রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, অর্থনৈতিক সুবিধা, অবকাঠামোগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের আলোকে করা গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বন্দর ও নৌপথ ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকলে দূরত্ব ও পরিবহন সময় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্যও আঞ্চলিক ট্রানজিট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে রাজস্ব, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই এসব ব্যবস্থার মূল্যায়নে দুই দেশের স্বার্থের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সুবিধাও বিবেচনায় আসবে।

চুক্তি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হতে পারে—কোনো ব্যবস্থায় বাংলাদেশের আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা কতটা, স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর তার প্রভাব কী, বাংলাদেশের বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার নিজস্ব অগ্রাধিকার কীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সংযোগ থেকে বাংলাদেশ কীভাবে আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে পারে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হলে তা সম্পর্কের বিরোধিতা নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার একটি প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রক্রিয়া হতে পারে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অবশ্য কেবল বন্দর বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, পানি এবং আঞ্চলিক সংযোগ—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি বিস্তৃত আন্তঃনির্ভরতা গড়ে উঠেছে। ফলে সম্পর্কের নতুন কাঠামো নির্ধারণের সময় পুরোনো সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

পানি ব্যবস্থাপনাও সামনে বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। ফলে বছরের শেষ দিকে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন এবং দুই দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতার কারণে ভবিষ্যৎ পানি সহযোগিতার কাঠামোও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর বিষয়ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আলোচ্য। এসব বিষয়ে সমাধান খুঁজতে হলে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি কারিগরি তথ্য, নদীর প্রবাহ, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য পানি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতিও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সীমান্তে প্রাণহানি, চোরাচালান, অবৈধ পারাপারসহ বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সময়ে সময়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে কূটনৈতিকভাবে উদ্বেগ জানানোর কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় নিতে হলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ এবং বিদ্যমান প্রটোকলের বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ঢাকার নতুন অবস্থানের আরেকটি দিক হলো দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া। বহুপক্ষীয় সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ চাইছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো সরাসরি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজতে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যেও এই দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, ঢাকা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই বিভিন্ন মতপার্থক্য ও উদ্বেগকে সরাসরি আলোচনার টেবিলে নিয়ে যেতে চাইছে।

তবে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে আলোচনার ফলাফল এবং দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতার ওপর। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক এতটাই বিস্তৃত যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি কার্যকর করতে হলে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, দক্ষ দর-কষাকষি এবং বিকল্প অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনার উদ্যোগের ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—পর্যালোচনা চলছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে কোন চুক্তি বহাল থাকবে এবং কোন চুক্তিতে পরিবর্তন আসবে, তা নির্ধারণের আগে প্রতিটি চুক্তির বাস্তব সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করা হবে বলে ধারণা করা যায়।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি সম্পর্কচ্ছেদ বা বিরোধের দিকে যাওয়া হিসেবে দেখার চেয়ে নীতিগত পুনর্মূল্যায়নের পর্যায় হিসেবে দেখা বেশি তথ্যসম্মত। একদিকে দুই দেশ প্রতিবেশী এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগগত সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্পর্ক পরিচালনায় জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান ও ভারসাম্যের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত এই পুনর্মূল্যায়নের সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনার মাধ্যমে কতটা বাস্তবসম্মত ও পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা যায় তার ওপর। বাংলাদেশের জন্য যেমন জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থনৈতিক সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যও আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। দুই দেশের এসব স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক পরিচালনা করা হলে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। বর্তমানে ঢাকার অবস্থান থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই সেই সম্পর্কের কাঠামো ও অগ্রাধিকারকে বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত