ইমরান খানের কারাজীবন নিয়ে দুই ছেলের বিস্ফোরক দাবি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩২ বার
ইমরান খানের কারাজীবন নিয়ে দুই ছেলের বিস্ফোরক দাবি

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের কারাবন্দিত্ব ও চিকিৎসা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলাইমান খান। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কারাগারে তাদের বাবার সঙ্গে কঠোর আচরণ করা হচ্ছে। এমনকি ইমরান খানকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

লন্ডন থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাসিম ও সুলাইমান তাদের বাবার বর্তমান শারীরিক অবস্থা, কারাগারে অবস্থান এবং চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা জানান। তারা দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে ইমরান খানের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ সীমিত রয়েছে এবং তার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়েও তারা পর্যাপ্ত তথ্য পাচ্ছেন না। বিশেষ করে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তির অবনতির বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

ইমরান খান ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। বিভিন্ন মামলায় তার বিরুদ্ধে একাধিক আইনি কার্যক্রম হয়েছে। সর্বশেষ দুর্নীতির একটি মামলায় তিনি ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তার দল ও আইনজীবীরা বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে আসছেন, তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। তবে পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

ইমরানের দুই ছেলের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কারাগারে তাদের বাবার স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের পরিস্থিতি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান খানকে একটি ছোট কক্ষে প্রায় একাকী রাখা হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগের সুযোগও সীমিত রয়েছে। তারা দাবি করেন, বাবার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এ অবস্থায় স্বাধীন চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

তবে পাকিস্তান সরকার ইমরান খানের প্রতি অমানবিক আচরণের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, কারাগারে তাকে প্রয়োজনীয় খাবার, ব্যায়ামের সুযোগ, পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ইমরানের পরিবারের অভিযোগ এবং সরকারের বক্তব্যের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের আদালতেও গুরুত্ব পেয়েছে। আগস্টে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট তার চিকিৎসার বিষয়ে একাধিক নির্দেশনা দেয়। আদালত তাকে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়া এবং তার চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল। একই সঙ্গে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও নির্দেশনা আসে।

পরবর্তী সময়ে ইমরান খানকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিকিৎসকরা তাকে পরীক্ষা করে চিকিৎসাগতভাবে স্থিতিশীল বা চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত অবস্থায় পেয়েছেন। অন্যদিকে তার পরিবার ও আইনজীবীদের পক্ষ থেকে তার চোখের সমস্যাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে ইমরানের প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কও চলছে।

ইমরানের দুই ছেলে তাদের বাবার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে তার পুরোনো রাজনৈতিক বিরোধের সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইমরান প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় আসিম মুনিরের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের বাবার বিরুদ্ধে আইনি ও রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। তবে এই দাবিটি ইমরানের পরিবারের পক্ষের অভিযোগ; পাকিস্তানের সরকার বা সেনাবাহিনী তাদের বক্তব্যকে এভাবে স্বীকার করেনি।

ইমরান খান ও পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী পদ হারানোর পর তিনি সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। পরবর্তী সময়ে তার দল ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক আরও তীব্র বিরোধে রূপ নেয়। ২০২৩ সালে তার গ্রেপ্তার এবং এরপর পিটিআই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে।

কারাবন্দিত্বের সময় ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে তার পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে চোখের সমস্যার বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। তার আইনজীবীরা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার দাবি করেছেন। অন্যদিকে সরকারি চিকিৎসা মূল্যায়নে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে। ফলে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা মূল্যায়নের দাবি ইমরানের পরিবারের বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে।

ইমরানের দুই ছেলে আরও জানিয়েছেন, তারা বাবার মুক্তি ও তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথা বলছেন। তবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ করার পরিকল্পনা তাদের নেই বলেও জানিয়েছেন তারা। তাদের মূল উদ্বেগ বাবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং কারাগারে তার সঙ্গে আচরণ নিয়ে।

ইমরানের রাজনৈতিক দল পিটিআইও তার মুক্তির দাবিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। দলটির পক্ষ থেকে ইমরানের চিকিৎসা, কারাগারে সুযোগ-সুবিধা এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে ইমরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারাও ইমরানের দীর্ঘদিনের আটক ও কারাবন্দিত্বের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইমরানের মামলা, তার কারাবন্দিত্ব এবং চিকিৎসা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মন্তব্যের পাশাপাশি পাকিস্তানের আদালতের কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, তার চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার নিয়ে আদালত ইতোমধ্যে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে।

ইমরান খানের দুই ছেলের সর্বশেষ বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন তার স্বাস্থ্য, কারাবাস এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে পাকিস্তানে নতুন করে আলোচনা চলছে। একদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার বলছে, তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও কারাগারের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা নির্ধারণে স্বাধীন চিকিৎসা প্রতিবেদন, আদালতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইমরানের দীর্ঘ কারাবাস তার ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পাকিস্তানের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের সদস্যরা একদিকে তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, অন্যদিকে পিটিআই তার রাজনৈতিক মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। ইমরানের ছেলেরা অবশ্য জানিয়েছেন, তারা বাবার পাশে থাকার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে কথা বললেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই।

এখন নজর রয়েছে ইমরান খানের চিকিৎসা ও কারাবন্দিত্ব নিয়ে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার দিকে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত, চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন এবং সরকারের অবস্থান—এসবের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য ও কারাগারে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চলমান বিতর্কের আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের অভিযোগ ও সরকারি বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটিও ভবিষ্যৎ আইনি ও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত